

সেদিন আর বৃষ্টি থামেনি। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল, বৃষ্টি আরও বাড়ল। ছেলেটাকে আর বাড়ি ফেরার কথা বললেন না শওকত সাহেব। বরং রাতটা থেকে যেতে বললেন। প্রথম দিকে সুফিয়ান বেশ ইতস্তত করলেও ধীরে ধীরে তার জড়তা কাটতে শুরু করল। রাতের খাবারের পর দুজনের বেশ খানিকক্ষণ গল্প হলো। পড়াশোনা নিয়ে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে, জীবনের নানা চড়াই-উতরাই নিয়ে। ছেলেটার কথা শুনতে শুনতে শওকত সাহেবের মনে হলো, বাবা মারা যাওয়ার পর সুফিয়ানের জীবনটা মোটেও সহজ ছিল না। গ্রামের সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে এসে মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ পাওয়া, নিজের খরচ সামলানো, পড়াশোনায় ভালো রেজাল্ট ধরে রাখা—সবকিছুর পেছনেই ওর নিরন্তর সংগ্রাম। অথচ ছেলেটার কোনো অভিযোগ নেই। নিজের কষ্টগুলোকে যেন খুব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছে সে। শওকত সাহেবের ভালো লাগল। প্রতিকূলতার কাছে হার না মানতে শেখা একটা লড়াকু ছেলে সুফিয়ান। আর তাঁর পড়াকু মেয়েটা এমন একটা ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে, এতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই। মেয়েটা এমনিতেই খুব একটা মিশুক নয়। সবার সঙ্গে সহজে কথা বলতে পারে না, চট করে কাউকে আপন করে নেওয়ার স্বভাবও তার নেই। নিজের জগৎটুকু নিয়েই থাকতে ভালোবাসে। অথচ সুফিয়ানের সঙ্গে তার বেশ স্বচ্ছন্দ সম্পর্ক। ছেলেটার সামনে মেয়েকে কেমন নির্ভার দেখাচ্ছিল। কথায় কথায় হাসছিল, মাঝেমধ্যে খুনসুটিও করছিল। বন্ধুত্ব এমনই হয়। দুজন মানুষের স্বভাব আলাদা, বেড়ে ওঠার পরিবেশ আলাদা, তবুও কোনো একটা জায়গায় এসে তারা পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায়। সেদিন তিনি জানতেন না, এই ছেলেটাই একদিন তাঁর মেয়ের জীবনের এতটা জুড়ে থাকবে। কিংবা একদিন এই দুজনের সম্পর্ক নিয়েই তাঁকে এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজের এত দিনের বিশ্বাসকেও নতুন করে ভাবতে হবে। পড়াকু মেয়েটা আর লড়াকু ছেলের বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর টানাপোড়েন পেরিয়ে একসঙ্গে পথচলা, অতঃপর ভালোবাসা ফুরিয়ে যাওয়ার গল্প এটা। কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব বেঁচে থাকলে কি সত্যিই ভালোবাসা ফুরিয়ে যায়? নাকি সম্পর্কের ইতি ঘটলেও কোথাও না কোথাও টিমটিম করে জ্বলতে থাকে ভালোবাসার প্রদীপ, যার আলোয় দুজন মানুষ আজীবন একে অপরের আপন হয়ে থেকে যায়?