

নীলুর যখন আকদ হয়েছিল আমরা তখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। স্বাধীনতার পরে একজন সুদর্শন অমায়িক শিক্ষক বাংলা বিভাগে যোগদান করেছেন। আরো শুনলাম তিনি নীলুর বর। স্যার প্রথম যখন আমাদের ক্লাসে এলেন তখন আমি নীলুর পাশে বসে মুগ্ধ নয়নে স্যারকে দেখলাম এবং খুব খুশি হয়েছিলাম এমন সুদর্শন একজন মানুষ বন্ধু নীলুর স্বামী বলে। স্যার ক্লাসে যখন আসতেন আমরা যারা জানতাম তখন লেকচার শোনার চেয়ে নীলুর বরকে উৎসুক নয়নে দেখতাম। নীলু ক্লাসে তখন মাথা নিচু করে ঘামতে থাকত। নীলু তখন লজ্জাবতী কন্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অন্য স্যারদের সাথে সম্পর্ক ছিল গুরু-শিষ্যের। ইতোমধ্যে আমার বাবা না ফেরার দেশে চলে যান। আমার বিয়ে, বাচ্চা এবং পরীক্ষা সব মিলিয়ে আমি একটা ঝড়ের মধ্যে পড়েছিলাম। এদিকে সব বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল। কারো কোনো ঠিকানা জানা ছিল না। পরবর্তীতে একমাত্র নীলুকে খুঁজে পেলাম। তখন নীলু তিন কন্যার জননী এবং একটি কলেজে পড়ায়। ওর বাসার কাছেই ছিল আমার চাচার বাসা। জানতে পারলাম চাচার বাসার কাছেই চায়না বিল্ডিংয়ে নীলু থাকত। আমি ঠিকানা জোগাড় করে একদিন পায়ে হেঁটে নীলুর বাসায় চলে গেলাম। ছুটির দিনগুলোতে আমি চাচার বাসায় যেতাম এবং নীলুর বাসায়ও যেতাম। সেই সময় নীলুর তিন কন্যা ও স্যারের সাথে ঘনিষ্ঠ হই। স্যার খুব পড়াশোনা করতেন। তার বড়ো কন্যা উপমার কথা না বললেই নয়। সেও খুব বই পড়ত এবং মিষ্টি একটি মেয়ে সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। আমাদের তিনজনের মধ্যে বইয়ের একটা মেলবন্ধন ছিল। স্যার ছিলেন সদালাপী, সবসময় মুখে হাসি লেগেই থাকত। তিনি বহুগুণে গুণান্বিত একজন সরল মনের ভালো মানুষ। স্যারের সাথে দর্শন, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হতো। অনেক কিছু শিখেছি স্যারের কাছ থেকে এটা আমার পরম পাওয়া। স্যারের মতো একজন সৎ, নির্লোভ, দায়িত্ববান মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। তাঁর তিন কন্যার সাথে ছিল আমার বন্ধুর মতো সম্পর্ক। কত খেয়েছি কত সময় কাটিয়েছি নীলুর পরিবারের সঙ্গে। স্যার খুব বাজার করতে ভালোবাসতেন। প্রত্যেক মৌসুমি ফল স্যার নিজে কিনে আনতেন। কিছুদিন আগে এক দুপুরে ভাত খেলাম তিনজন মিলে। নীলু খুব ভালো রান্না করে। সেদিন ছিল মাছ, গরুর মাংস, আরো অনেক কিছু। স্যার আমার দিকে বাটিগুলো এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটা খান, ওটা খান। স্যার বললেন, সবকিছু খাবেন, নীলু খুব ভালো রান্না করে।