

বিশ্বনন্দিত শ্রেষ্ঠতম ফার্সী কবিদের অন্যতম হাফেয সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের পাঠক-পাঠিকাদের নিকট বেশী কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তাঁর “দীওয়ানে হাফেয” বাংলা ভাষা সহ বিশ্বের সকল গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তবে যারা ফার্সী জানেন এবং মূল ফার্সী “দীওয়ানে হাফেয” পাঠ করেছেন তাঁরা স্বীকার করতে বাধ্য যে, কোনো ভাষার অনুবাদেই মূল ফার্সী “দীওয়ানে হাফেয”-এর ভাব ও তাৎপর্যের গভীরতা হুবহু ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। হাফেয অনেক বেশী লিখেন নি। তাঁর কম লেখার কারণ, তিনি কেবল তাঁর অন্তরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেখার ভাব জাগ্রত হলে তথা ইলহাাম হলে তখনই লিখতেন। এর ফলে তাঁর গযল সমূহে যে অতুলনীয় সমুন্নত ভাব ও তাৎপর্যের গভীরতা ফুটে উঠেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে হাফেযকে “লিসাানুল্ গায়ব্” (অতিন্দ্রিয় জগতের কণ্ঠস্বর) বলা হয়। এ কারণেই অন্য ভাষায় তাঁর গযল সমূহের ভাব ও তাৎপর্যের গভীরতা হুবহু ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। বিশেষ করে তাঁর দীওয়ানের প্রথম গযলটির অনন্যসাধারণ ও ব্যাপক তাৎপর্য, ভাবাবেগ, ছন্দের ব্যঞ্জনা ও বিষয়বস্তুবৈচিত্রের কারণে এটি সম্পর্কে আমার অনুভূতি এই যে, তিনি যদি তাঁর সারা জীবনে এই একটিমাত্র গযল ব্যতীত আর কোনো কিছু না-ও লিখতেন তথাপি তাঁর নাম বিশ্বসাহিত্যের সর্বশীর্ষে স্থান দেয়া অপরিহার্য হতো। হাফেয ছিলেন একই সাথে মানবিক প্রেমের ও ঈশ্বরপ্রেমের কবি। তিনি তাঁর সারা জীবনে মাত্র ৫০০ গযল লিখেছেন। তবে তাঁর দীওয়ান-ভুক্ত গযল সমূহ ছাড়াও তিনি ৪২টি রুবা‘ঈ (চতুষ্পদী কবিতা) ও কয়েকটি ক্বাছীদাহ্ও লিখেছেন। ইতিপূর্বে বাংলা ভাষায় “রুবা‘ঈআতে হাফে”-এর একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সে সব অনুবাদে প্রধানতঃ ছন্দের প্রাধান্য দিতে গিয়ে মূল ফার্সীর তাৎপর্য ও ভাবধারা হতে অনেক ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরী হয়েছে। তবে সে জন্য অনুবাদকগণকে দোষারোপ করা উচিত হবে না। কারণ, এটা হাফেযের রুবা‘ঈ সমূহের সমুন্নত ভাবধারারই ফলশ্রুতি। এ কারণে এক যুগ আগে হাফেযের রুবা‘ঈগুলো অনুবাদে আগ্রহী হই এবং অনুবাদে হাত দেই। মূল ফার্সী টেক্স্ট্গুলো ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করি। বলা বাহুল্য যে, মাত্র ৪২টি রুবা‘ঈ অনুবাদে খুব বেশী সময় লাগার কথা নয় এবং আসলেও বেশী সময় লাগে নি। কিন্তু নিজের অনুবাদে আমি নিজেই সন্তুষ্ট হতে পারি নি। তাই মাঝে মাঝেই সেগুলো পড়েছি এবং অনুবাদের মান উন্নততর করার চেষ্টা করেছি। অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি মূল ফার্সীর তাৎপর্যের ওপর বেশী গুরুত্ব আরোপ করেছি। ফলে কতক ক্ষেত্রে অনুবাদে মূল রুবা‘ঈর মাত্রা ঠিক রাখা সম্ভব হয় নি; সে সব ক্ষেত্রে বাংলা পঙক্তিগুলো ফার্সী পঙক্তিগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হয়েছে। অবশেষে, আমার লেখার আগ্রহী পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যে যারা জানেন যে, আমি “রুবা‘ঈআতে হাফেয্”-এর বাংলা অনুবাদ করেছি তাঁদের কারো কারো বিশেষ আগ্রহের কারণে এটিকে প্রকাশোপযোগী করার কাজে হাত দেই। এ লক্ষ্যে এতে হাফেযের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি যোগ করেছি। এছাড়া বিভিন্ন সময় “দীওয়ানে হাফেয” থেকে কয়েকটি গযল এবং ইন্টারনেট থেকে পাওয়া হাফেযের কয়েকটি উদ্ধৃতি অনুবাদ করেছি। যেহেতু পুরো “দীওয়ানে হাফেয” অনুবাদ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে বলে মনে করি না সেহেতু উক্ত গযলগুলোর ও উদ্ধৃতিগুলোর অনুবাদ অত্র গ্রন্থের শেষে যোগ করেছি। যদিও মূল ফার্সীতে নিহিত তাৎপর্য ও ভাব প্রতিফলনের মানদণ্ডে অনুবাদের মান সম্পর্কে আমি নিজেই সন্তুষ্ট নই, তথাপি অত্র গ্রন্থের পাঠক-পাঠিকাগণ যাতে “দীওয়ানে হাফেয”-এর সাথে কিছুটা হলেও পরিচিত হতে পারেন সে লক্ষ্যেই তা যোগ করা সঙ্গত বলে মনে করেছি। এছাড়া যে সব বাংলাভাষী পাঠক-পাঠিকা ফার্সী জানেন না তাঁরা যাতে মূল ফার্সী রুবা‘ঈর ধ্বনি ও ছন্দের স্বাদ কিছুটা হলেও পেতে পারেন সে লক্ষ্যে প্রতিটি রুবা‘ঈর আধুনিক ফার্সী উচ্চারণও বাংলায় যোগ করেছি।