
আমার আম্মা দেখতে কেমন জানি না। তবে আড়ালে আবডালে গুঞ্জন আছে, জানি আম্মা বেঁচে আছেন। কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কেউ এ বিষয়ে কিছু বলে না। আব্বা খুব রাগী মানুষ, তাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা একদম নিষেধ। আমার দাদী, আম্মা কে নিয়ে মাঝে মাঝে এটা সেটা বলতেন। আম্মার স্মৃতি বা আম্মা সম্পর্কে জানা, দাদির মুখের কথাটুকুই। তবে দাদী আমার আম্মাকে মনে হয় একদমই পছন্দ করতেন না। তাই হয়তো আম্মা সম্পর্কে টুকটাক যা বলতেন, সবই নেগেটিভ। তবে ঐটুকু কথায়ই আমার ছোট্ট মনে আম্মার ছোঁয়া লাগতো। দাদীর মুখের নিন্দা-মন্দটুকু থেকে আম্মার একটা মায়াবী আদল আমার হৃদপিণ্ডে তৈরি হতো। সেই মায়ের মুখের আদলের আদরটুকু আর হৃদপিণ্ড উপভোগ করতো। একবার আব্বা এসে বললেন - "তৈরি হও, মেলায় নিয়ে যাবো।" সাথে শাহ মোস্তফার মেলায় গেলাম। নিজে নিজে চুল আঁচড়ে দুইটা ঝুটি করলাম। ঠোঁটে লাল রংয়ের লিপস্টিক দিলাম। তারপর আব্বার সাথে শাহ মোস্তফার মেলায় গেলাম। কত শত মানুষ! এতো মানুষ একসাথে জীবনে প্রথম দেখেছিলাম। এতো এতো মানুষের ভিড় ঠেলে আব্বা আমাকে অনেক কিছু কিনে দিলেন: বেলুন, কাঠের হাঁড়ি, উখড়া খই, বাতাসা, বড়ফি, চুড়ি, চুলের ক্লিপ, মালা। আমি শুধু মানুষের ভিড়ে আম্মাকে খুঁজেছি। আমার ছোট মনের ভাবনায় ছিল, আম্মা এখানে এসেছে। আম্মাকে সেই মেলায় খুঁজে না পেয়ে তুলার পুতুল কিনেছিলাম। আমার খেলার সাথী লিপির সাথে বিকেলে বসে বসে পুতুল খেলি। লিপি পুতুলকে মেয়ে বানিয়ে খেলতো। আমি পুতুলকে মা বানিয়ে খেলতাম। পুতুলকে আম্মা ডাকতাম। লিপি খিলখিল করে হাসতো। বড় হয়ে বুঝতে পারলাম, পুতুলকে আম্মা বানিয়ে খেলা জগতের সবচেয়ে বিরল ঘটনার একটা। আম্মার জন্য আমার হৃদয়ে কত ব্যাকুলতা ছিল সেই ছোট্ট বেলায়। দাদি চায় আমি আম্মাকে ঘৃণা করি। অথচ দাদি এটা জানে না, আম্মাকে নিয়ে তার নিন্দা-মন্দ আমার মনে আরো ব্যাকুলতা বাড়ায়। আমি আরো ভালোবেসে ফেলি আম্মাকে। আম্মাকে দেখার তীব্র টান আমাকে কি পরিমাণ যন্ত্রণা দেয়।
