
‘মাট্রোনালিয়া’ এককথায় এক পৌরাণিক মিথের আবহে নির্মিত মানবিক অনুভূতির কাব্য। এখানে প্রেম জন্ম নেয় আলো নয়, বরং আদিম অন্ধকারের গর্ভে। সৃষ্টি আসে আকাঙ্ক্ষা, ব্যথা, একাকিত্ব ও পুনর্জন্মের মধ্য দিয়ে। প্রতিটি কবিতাই যেন বহু হাজার বছর আগের কোনো হারানো সভ্যতার স্মৃতি, যেখানে শব্দ ছিল শক্তি, উচ্চারণ ছিল আচার, আর অনুভূতিই সৃষ্টি করত দেবতা ও ছায়াদের। এই বইয়ে দ্রোহের বিস্তার মানুষকে ছাড়িয়ে সমগ্র মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। দেবতা ও মানুষের সীমারেখা এখানে বারবার ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়; কখনো মানুষ উঠে দাঁড়ায় দেবশক্তির উচ্চতায়, আবার কখনো দেবতারা নেমে আসে নিজস্ব ধাম থেকে, ডুবে যায় অপরাধবোধ, নীরবতা ও গভীর অন্ধকারে। আগুন, বৃষ্টি, ছায়া, পাথর, বাতাস—প্রতিটি প্রাকৃতিক উপাদান এখানে রক্তমাংসের চরিত্রের মতো প্রাণ পায়; তারা মানুষের মতোই ভালোবাসে, ক্ষুব্ধ হয়, ভেঙে পড়ে, এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের ছাই থেকে আবার নতুন হয়ে জন্ম নেয়। রোমান মাট্রোনালিয়ার মাতৃত্বশক্তি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নারীত্ব এই বইয়ে আদিম শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী এখানে শুধু সৃষ্টির বাহক নয়—ধ্বংস, পুনর্জন্ম এবং মহাজাগতিক সমতার প্রধান উৎসেও পরিণত হয়েছে। স্মৃতি, বিস্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া প্রেম, নক্ষত্রের বিস্ফোরণ, প্রাকৃতিক শক্তির টানাপোড়েন—এসব মিলিয়ে বইটি এক নতুন পুরাণতত্ত্ব সৃষ্টি করে। এখানে সময় সরলরেখায় চলে না; কখনো বর্তমান ঢুকে পড়ে প্রাচীন অলিন্দে, কখনো আদিম পুরাণ এসে বসে বর্তমান মানুষের হৃদয়ের কাছে। ব্যথা এখানে শুধু কষ্ট নয়—এক দেবীয় শক্তি, যা মানুষকে পরিশুদ্ধ করে, নতুন করে জন্ম দেয়। ‘মাট্রোনালিয়া’ এমন এক অনুভূতির জগৎ, যেখানে প্রতিটি শব্দই নক্ষত্রধূলির মতো; গাঢ়, প্রাচীন, অথচ তীব্রভাবে ব্যক্তিগত। পাঠক বইটি পড়তে পড়তে অনুভব করবে—সে কোনো সাধারণ কবিতাসমগ্রে নয়, বরং এক পৌরাণিক মানচিত্রে হাঁটছে, যেখানে প্রতিটি মোড়েই অপেক্ষা করছে নতুন সৃষ্টি, নতুন প্রেম, নতুন দ্রোহ এবং নতুন কোনো প্রাচীন সত্য।