
সংসারের বয়স অনেক দিন হয়ে গেলে একটা সংঘাত দেখা দেয়, সঙ্গে মনে কিছু প্রশ্ন জাগে। “তোমাকে বুঝি না, প্রিয়— বোঝো না না তুমি আমায়, দূরত্ব বাড়ে, যোগাযোগ নিভে যায়।” সময়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে; এক ছাদের নিচে থেকেও কাছের মানুষ হয়ে যায় ভীষণ দূরের। শাওলীর অবস্থাও তেমনই হচ্ছে দিন দিন। শাওলী ফোনটা একপাশে রেখে ভাতে চিংড়ির গুঁড়া মিশালো। এসব কথা এখন আর গায়ে লাগে না। বউদের এত কিছু গায়ে লাগলে চলে না। মেয়ে থেকে বউ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গায়ের চামড়া করতে হয় গণ্ডারের চামড়া। শাশুড়ি কাটবে, লবণ দেবে, দরকার হলে লাল মরিচের গুঁড়া দেবে শরীরে—তাও হাসিমুখে বলতে হবে, “মা, ঝাল একটু কম হয়েছে। আর একটু দিয়ে ঢেলে দেন। আপনার তো ঝালটা একটু কড়া পছন্দ।” শাওলীর চামড়া আজকাল গণ্ডারের চামড়া হয়ে গেছে। সঙ্গে ঠোঁটে একটা গায়ে জ্বালা ধরানো হাসি রপ্ত করেছে। বউমানুষদের এমন টুকটাক অস্ত্র মজুদ করা লাগে। একেবারে খালি হাতে তো আর সংসারের রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা যায় না। বাঁকা চাউনি, ঠোঁটের কোণে জ্বালা ধরানো হাসি—এসব বউদের গোপন অস্ত্র। অনেকটা হাতে না মেরে ভাতে মারা টাইপ আর কী! বিয়ের প্রথম তিন মাসে আসিফ একটু ‘উহ্’ করলেও শাওলী ব্যস্ত হয়ে যেত। কোনো অসুবিধা হলো কি না, শাওলীর কোনো কাজে বিরক্ত হয়েছে কি না—তা যতক্ষণ জানতে না পারত, ততক্ষণ মনের ভেতর খচখচ করত। একেবারেই কিছু বুঝতে না পারলে আকুল হয়ে কাঁদত—আর দশটা বোকা মেয়ে যেমন করে, আর কী! তাতে আসিফ বিরক্তই হয়েছে। বিরক্ত হয়ে বেশ কয়েকবার মুখের ওপর বলে দিয়েছে, “শাওলী, নাটক ছাড়া তুমি কি আর কিছু জানো না?” লজ্জায় অপমানে তখন মাথা কাটার অবস্থা। মনে মনে কতশত বার যে বলেছে, “ধরণী দ্বিধা হও, আমি মুখ লুকাই।” ঝকঝকে টাইলসে বিন্দুমাত্র ফাটলও দেখা যায় না—শাওলীর মুখ লুকানোও হয়ে ওঠে না। তবে সব অপমানেরই একটা ভালো দিক আছে। মোটামুটি শিক্ষা হয়ে গেছে—যে যতটুকু চায়, তাকে ততটুকুই দিতে হয়। আশার বেশি পেয়ে গেলে মানুষের কাছে সোনাও মাটি হয়ে যায়।