

ফিলিস্তিন ইসলামের অন্যতম পবিত্র ভূমি। মুসলমানদের প্রথম ক্বিবলাহ্ বায়তুল মুক্বাদ্দাস এই ফিলিস্তিনেরই কেন্দ্রবিন্দু। অন্য কথায়, বায়তুল মুক্বাদ্দাস ফিলিস্তিনের প্রাণস্বরূপ। বায়তুল মুক্বাদ্দাসবিহীন ফিলিস্তিন একটি প্রাণহীন দেহতুল্য—যদিও সে দেহও একটি পবিত্র দেহ। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর চরম দুর্ভাগ্য যে, তাদের প্রিয় ভূমি ফিলিস্তিন এবং ততোধিক প্রিয় বায়তুল মুক্বাদ্দাস ইসলামের দুশমনদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আজ জায়নবাদী নরপিশাচদের পদানত। অবশ্য ফিলিস্তিনের অংশবিশেষে (জর্দান নদীর পশ্চিম তীরে) আজ ইসরাঈলী সার্বভৌমত্বের অধীনে তথাকথিত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ খণ্ডিত ফিলিস্তিনের বুকে একটি নামমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার লক্ষ্যে বায়তুল মুক্বাদ্দাসের ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়ে জায়নবাদী ইসরাঈল এবং তার পৃষ্ঠপোষক আমেরিকার মধ্যস্থতায় তথাকথিত ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষের আলোচনা চলছে। অন্যদিকে গাজ্জার মুসলমানরা জান-মালের বিরাট ক্ষতি স্বীকার করে সমগ্র ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার লক্ষ্যে জায়নবাদী ইসরাঈলের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। লেবাননের হিযবুল্লাহ বাহিনীও ফিলিস্তিনের মুক্তির লক্ষ্যে প্রাণ বাজি রেখে লড়াই করে চলেছে। যদিও বহিরাগত জবরদখলকারী জায়নবাদীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাঈলকে উৎখাত করে সমগ্র ফিলিস্তিন ভূখণ্ড জুড়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠা ছাড়া ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান সম্ভব নয়, তথাপি পশ্চিম তীরের তথাকথিত ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষ খণ্ডিত ফিলিস্তিন মেনে নেওয়া সত্ত্বেও জায়নবাদী ইসরাঈল পূর্ব জেরুজালেম—অর্থাৎ বায়তুল মুক্বাদ্দাসের ওপর ফিলিস্তিনীদের অধিকার মেনে নিতে মোটেই প্রস্তুত নয়। আর এ ব্যাপারে আমেরিকাসহ গোটা ক্রুসেডার বিশ্বের লক্ষ্য হচ্ছে ফিলিস্তিনীদেরকে জায়নবাদীদের অবৈধ স্বার্থের যূপকাষ্ঠে নিজেদের ন্যায্য স্বার্থ বলিদানে বাধ্য করা। জায়নবাদী ইসরাঈল ও তার পাশ্চাত্য পৃষ্ঠপোষকরা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে গোয়েবলসীয় কায়দায় প্রচার চালিয়ে অবৈধ দখলদার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদী ইসরাঈলীদেরকে শান্তিকামী ও মজলুম হিসেবে এবং অধিকারবঞ্চিত ফিলিস্তিনীদেরকে ও তাদের সমর্থনে লড়াইরত হিযবুল্লাহকে উগ্র সন্ত্রাসবাদী ও ‘ধর্মান্ধ’ (!?) হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। শুধু পাশ্চাত্যের জনগণই নয়, এমনকি অনেক মুসলমানও তাদের সৃষ্ট বিভ্রান্তি ও প্রচারণার শিকার হয়ে মনে করছে যে, ইসরাঈলেরও টিকে থাকার অধিকার রয়েছে। তাই তারা ইসরাঈলকে উৎখাতের দাবিকে চরমপন্থী ও অন্যায় দাবি বলে মনে করে। অথচ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে—না ইসরাঈল কোনো স্বাভাবিক রাষ্ট্র, না ইসরাঈলীরা কোনো স্বাভাবিক জাতি, না তারা ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের বৈধ অধিবাসী। বরং সারা দুনিয়া থেকে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর ইয়াহুদীদের এনে জড়ো করে তৈরি ইসরাঈলী জনগোষ্ঠী যেমন একটি কৃত্রিম জাতি, তেমনি ফিলিস্তিনের বুকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ইসরাঈল একটি অবৈধ কৃত্রিম রাষ্ট্র। এ জাতি ও এ রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে ফিলিস্তিনীদের তাদের ভিটেমাটি, বাড়িঘর ও ভূখণ্ড থেকে উৎখাত করে। তাই ইনসাফের দাবি হচ্ছে—এই কৃত্রিম রাষ্ট্রকে উৎখাত করা এবং এই কৃত্রিম জাতিকে বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে তাদের নিজ নিজ উৎসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া। জায়নবাদী আন্দোলনের নেতারা ও তাদের স্বার্থান্বেষী অনুসারীরা সরলমনা ইয়াহুদীদেরকে ফিলিস্তিনের বুকে তাদের ঐতিহাসিক অধিকারের কথা বলে বিভ্রান্ত করেছে। শুধু তারাই নয়, অনেক মুসলমানও ইতিহাস সম্পর্কে যথাযথ ধারণা না থাকায় এই বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও)-এর আপোসকামী ভূমিকা এ বিভ্রান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে মুসলিম উম্মাহ এক নৈতিক দুর্বলতার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তাই ফিলিস্তিন প্রশ্নে সঠিক নীতি ও অবস্থান গ্রহণের জন্য এর ইতিহাস ও ইসলামী উত্তরাধিকারের সাথে পরিচিত থাকা এবং এর ওপর মুসলমানদের ঐতিহাসিক অধিকার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলা ভাষায় এ সংক্রান্ত বই-পুস্তক নেই বললেই চলে। তেমনি এ বিষয়ে আমাদের দেশের পত্রপত্রিকায়ও খুব কমই লেখালেখি হয়েছে।