
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নিম্নশ্রেণীর কবিয়াল ‘নিতাই’। গ্রামের এক কবিগানের আসরে কবিয়ালের অনুপস্থিতিতে সে কবিয়াল হয়ে ওঠে। তারাশঙ্কর নিতাই আর ঝুমুরদলের মাধ্যমে জীবনের অন্য এক অভিজ্ঞতা তুলে এনেছেন উপন্যাসটিতে। নিতাইয়ের জীবন উত্থান-পতনের, সফলতার, বিরহের, প্রেমের, পাওয়া-না-পাওয়ার। তার জীবনের দুটি অধ্যায়—প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখি, বাড়ি ছেড়ে স্টেশনে যাওয়া, পড়াশোনা করতে চাওয়া, আর এই অস্থির সময়ে বন্ধু রাজার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়া ঠাকুরঝির সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। উপন্যাসে যে বাক্যগুলো প্রবাদে পরিণত হয়েছে, তার সবই নিতাই ঠাকুরঝিকে উদ্দেশ্য করে বলেছে। ঠাকুরঝি কালো ছিল, তাই তার প্রতি মমত্ববোধে সে গানের পঙক্তি বেঁধেছিল—‘কালো যদি মন্দ তবে চুল পাকিলে কান্দ কেনে?’ দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখা যায়, বাড়ি ছেড়ে মা-বাবা-বন্ধু-ঠাকুরঝিকে পেছনে ফেলে পালিয়ে ঝুমুরদলে যোগ দেওয়া। কারণ ঠাকুরঝি ছিল বিবাহিতা, আর তাদের সম্পর্ক গ্রামে লোকমুখে জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। ঠাকুরঝিকে রক্ষা করতেই সে গ্রাম ছেড়ে ঝুমুরদলে যোগ দেয়। সেখানে বসন্ত নামে এক নারীর সঙ্গে তার প্রণয়ঘটিত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বসন্ত মারা গেলে সে আবার বাড়ি ফেরে। কিন্তু ফিরে এসে সে জানতে পারে, ঠাকুরঝি নেই। এই না-থাকার হাহাকার তাকে জীবনভর বয়ে বেড়াতে হয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি উপন্যাসটির বিশেষত্ব হচ্ছে এর দার্শনিকতা, শক্তিশালী চরিত্র ও সহজ-স্বাভাবিকতায় ছড়ানো গভীরতা। ফলে সহজেই আখ্যানটি মানুষের জীবনের অন্তর্গত আশা-হতাশার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে ফেলে। আর সব অর্জনের শেষে কবিয়াল নিতাই আমাদের শোনায়—“জীবন এত ছোট ক্যানে?”