“কেমন আছেন?” “আছি একরকম। আপনাদের সবার কী খবর?” “আলহামদুলিল্লাহ! কী খাবেন? চা নাকি কফি?” “কিছু না।” এইটুকু বলে আবারও পানি খেতে গিয়ে বোতল ফাঁকা দেখে গলা শুকিয়ে এল জিমির। পুনরায় জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজাল। ওয়াফি নিজের সামনে থাকা পানির বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে, সেটা জিমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “হঠাৎ এখানে?” জিমি ইতস্ততভাবে এদিক-ওদিক দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলল, “আমি ওনার সাথে দেখা করতে চাই!” ওয়াফি সামনে থাকা গোলগাল পেপারওয়েটকে আঙুলের সাহায্যে ঘুরিয়ে বুঝেও না বুঝার ভান ধরে জানতে চাইল, “কার সাথে?” জিমি আবার পানি খেল। গলায় জোর এনে বলল, “মাহীরা মুসকানের বাবার সাথে।” ওয়াফি ঠোঁট মুড়ে হেসে বলল, “আপনি কে?” “আমি জিমি।” নতমুখে উত্তর দিল জিমি। “হঠাৎ করে ওনার সাথে দেখা করতে চান কেন?” জিমি ভয়ডর মনে এঁটে বলল, “উনি কি বেঁচে আছেন?” “তার উত্তর আমি আপনাকে দেব কেন? যদি মাহীরা মুসকান এসে প্রশ্ন করে, তাহলে ভেবে দেখতাম!” “ভেবে দেখতেন মানে কী! স্পষ্ট করে বলুন... উনি কি বেঁচে আছেন?” ওয়াফি টেবিলে হাত রেখে, দৃঢ় অথচ শান্ত কণ্ঠে বলল, “আপনি আগে মাহীরা মুসকানকে নিয়ে আসুন। তারপর বলব।” “উফফ, আপনি আমার সময় নষ্ট করছেন! যা জিজ্ঞেস করছি, তার উত্তর দিন।” “সরি।” এই বলে ওয়াফি আবার ফোন হাতে নিয়ে গেমস খেলা শুরু করল। ঢিশুম-ঢাশুম আওয়াজও শোনা গেল। জিমি বিরক্ত হয়ে, ওয়াফির ফোন কেড়ে এনে একপাশে সরিয়ে রেখে বলল, “আপনি বলবেন কি না!” “বলব না।” একগুঁয়ের মতো উত্তর দিল ওয়াফি। “তাহলে আমাকে নিয়ে চলুন ওনার কাছে।” ওয়াফি এবার দ্বিগুণ কঠিন হলো। বলল, “আপনাকে ওনার কাছে নিয়ে যাব কেন?” “কারণ মাহীরা মুসকান চাইছে তার বাবার সাথে দেখা করতে। কথা বলতে। সে জানতে এসেছে, কেন তাকে এতগুলো দিন অন্য একটা পরিবারের কাছে মানুষ হতে হলো। সে জানতে এসেছে, কেন তাকে বাবার আদর-শাসন থেকে বঞ্চিত করা হলো। সে জানতে এসেছে, কী ঘটেছিল সেদিন... যার জন্য তার বাবাকে জেল খাটতে হয়েছে।” একসাথে এতগুলো কথা বলে ফুঁপিয়ে উঠল জিমি। কান্না লুকাতে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল। ওয়াফি টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলল, “এতগুলো বছর পর, এতসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা কি খুব জরুরি?” জিমি টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে, স্পষ্ট কণ্ঠে জানাল, “অবশ্যই জরুরি। নাহয় আমি নিজের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছি না। যখনই চারপাশে তাকাচ্ছি, আমার মনে হচ্ছে... ওই পরিবার আমার ওপর করুণা করেছে। শুধু তাই নয়... আমার কাছ থেকে সত্য এমনভাবে গোপন রাখা হয়েছে, যেন আমি কোনোদিন জানতে না পারি, আমার আসল পরিচয় কী! অবশ্যই এসবের জন্য আমি কাউকেই দোষ দিই না। সবটাই আমার ভাগ্য। কিন্তু তবুও... পেছনের সব কথা জানা দরকার আমার। জানা দরকার, কেন আমি অন্য একটা পরিবারের কাছে মানুষ হলাম। কেন আমি আমার জন্মস্থান থেকে দূরে। কেন আজও আমি জানি না... আমার জন্মদাত্রীর মৃত্যুর পেছনে ঠিক কী রহস্য লুকিয়ে আছে! এতসব প্রশ্নের উত্তর যতক্ষণ না আমি জানতে পারছি, ততক্ষণ নিজেকে শান্ত করতে পারব না। এমনকি নিজের এই জীবন, এটাকেও স্বাভাবিকভাবে টেনে নিতে পারব না। এই একটা সত্য জানার পর থেকে... আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।”