

কথাসাহিত্যিক, গবেষণা-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, উপন্যাসিক, উর্দু, ফার্সি, হিন্দি, ইংরেজি, রূপান্তর ব্যক্তিত্ব জনাব আবুল কালাম মুস্তাফা সাহেব।
আমার বাবা—কথাশিল্পী আবুল কালাম মুস্তাফা আমাদের বাবা আবুল কালাম মুস্তাফা শুধু আমাদের পিতা ছিলেন না—তিনি ছিলেন আমাদের গর্ব, প্রেরণা ও শিকড়ের এক উজ্জ্বল নাম। একজন সন্তান হিসেবে বাবাকে নিয়ে লিখতে বসলে স্মৃতির পাতা শেষ হতে চায় না; তাঁর সাহিত্যকর্মের কথা বলতে গেলে কলম শ্রদ্ধায় থমকে যায়। আমার ছোট ভাই আরমান আনোয়ার আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে বাবার সাহিত্যজীবনের যে চিত্র তুলে ধরেছে, তার সঙ্গে আমি শুধু এটুকুই যোগ করতে চাই—বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর নিরলস সাধনা। প্রচার-প্রতিষ্ঠার পেছনে না ছুটে তিনি নীরবে সাহিত্যসাধনা করে গেছেন। বাবার সাধনার অনন্য ফসল ‘নজরুল শব্দকোষ’। প্রায় পনেরো বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ৩১৪ পৃষ্ঠার এই গবেষণাগ্রন্থ তিনি সম্পন্ন করেন। নজরুলের ব্যবহৃত শব্দের উৎস, প্রয়োগ, গ্রন্থ ও পৃষ্ঠার নির্দেশনা এবং বিভিন্ন ভাষার শব্দমূল তুলে ধরে গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী যথার্থই একে ‘এক অনন্য শ্রমসাধ্য কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কথাসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ বাবার এই কাজ দেখে বলেছিলেন— ‘ভাই, আপনি তো দুরূহ একটি কাজ করেছেন!’ বাবার উল্লেখযোগ্য বই ‘শিকওয়া ও জওয়াব-ই-শিকওয়া’। এ ছাড়া ‘মেঘমল্লার’ উপন্যাস, ‘আলিবাবা চল্লিশ চোর’-এর উর্দু থেকে বাংলা রূপান্তরসহ বিভিন্ন গ্রন্থ অনুবাদ ও রূপান্তরের কাজও তিনি করেছেন। বাংলা, উর্দু, হিন্দি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষার ওপর তাঁর দখল ছিল বিস্ময়কর। এত প্রতিভা ও পরিশ্রমের পরও তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ—নীরবে কাজ করে যাওয়াই ছিল তাঁর স্বভাব। আমাদের প্রাণপ্রিয় বাবা ভোলার পৈতৃক বাড়ি থেকে ১৯৪৭ সালে একা ঢাকায় চলে এসেছিলেন। পরবর্তীকালে আর্থিক দৈন্যতা ও নানা বাস্তবতায় সেই পৈতৃক ভিটা আমাদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের নাগালের বাইরে চলে যায়। আজ সেখানে আমাদের শিকড়ের স্মৃতি আছে, কিন্তু সেই শিকড়ের স্পর্শ নেই। তবু আমরা গর্বিত—কারণ আমাদের শিকড় শুধু একটি বাড়ির মাটিতে নয়; একজন সৃষ্টিশীল, জ্ঞানী ও সাধক মানুষের জীবনে। তাঁর কলম, মেধা ও শ্রমে গড়ে ওঠা উত্তরাধিকারই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ২০০১ সালের ২ এপ্রিল বাবা চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। কিন্তু তাঁর স্নেহ, মমতা, কণ্ঠস্বর ও সাহিত্যসাধনা আজও আমাদের হৃদয়ে অম্লান। আমি তাঁর মেজো ছেলে আফতাব আনোয়ার—গভীর গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, আমি কথাশিল্পী আবুল কালাম মুস্তাফার সন্তান। বাবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা কোনো একটি দিবসের জন্য নয়; এটি সারাজীবনের। আল্লাহ আমার প্রিয় বাবাকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। বাবা, আপনি আমাদের মাঝে নেই—কিন্তু আমাদের হৃদয়ে আপনি চির অম্লান। আমিন। 🤲
Read all reviews on the Boitoi app
আমার বাবা—কথাশিল্পী আবুল কালাম মুস্তাফা ------------------------------------------------ আমাদের বাবা আবুল কালাম মুস্তাফা শুধু আমাদের পিতা ছিলেন না—তিনি ছিলেন আমাদের গর্ব, আমাদের প্রেরণা, আমাদের শিকড়ের এক উজ্জ্বল নাম। একজন সন্তান হিসেবে বাবাকে নিয়ে লিখতে বসলে স্মৃতির পাতা যেন শেষ হতে চায় না; আর তাঁর সাহিত্যকর্মের কথা বলতে গেলে কলম বারবার থমকে যায় শ্রদ্ধায়। আমার ছোট ভাই আরমান আনোয়ার অত্যন্ত আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে বাবার সাহিত্যজীবনের যে চিত্র তুলে ধরেছে, তার সঙ্গে আমি শুধু এটুকুই যোগ করতে চাই—বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর নিরলস সাধনা। প্রচার-প্রতিষ্ঠার পেছনে তিনি ছুটতেন না; বরং নীরবে, একাগ্রচিত্তে তাঁর সাহিত্যসাধনা চালিয়ে গেছেন। বাবার সেই সাধনার অনন্য ফসল ‘নজরুল শব্দকোষ’। প্রায় পনেরো বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি এই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ৩১৪ পৃষ্ঠার এই গবেষণাগ্রন্থ যে কতটা শ্রমসাধ্য ও ব্যতিক্রমী কাজ ছিল, তা উপলব্ধি করেছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বহু জ্ঞানী-গুণীজন। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরীর মূল্যায়নটি আজও আমাদের পরিবারের কাছে এক অমূল্য দলিল। তিনি লিখেছিলেন— ‘নজরুল শব্দকোষ’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ অনুভূত একটি প্রকাণ্ড অভাব পূরণ করেছে। তাঁর মতে, নজরুলের ব্যবহৃত শব্দের উৎস, প্রয়োগ, গ্রন্থ ও পৃষ্ঠার নির্দেশনা এবং আরবি-ফারসি-উর্দু-হিন্দি, সংস্কৃত ও ইংরেজি শব্দমূল নির্দেশ করার মধ্য দিয়ে গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক গবেষণার ক্ষেত্রকেও শক্তিশালী করেছে। তিনি যথার্থই একে ‘এক অনন্য শ্রমসাধ্য কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কথাসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ বাবার এই কাজ দেখে বলেছিলেন— ‘ভাই, আপনি তো দুরূহ একটি কাজ করেছেন!’ সত্যিই তো—‘নজরুল শব্দকোষ’ শুধু একটি বই নয়; এটি ছিল এক মানুষের দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায়, জ্ঞান ও ভালোবাসার এক অনন্য স্বাক্ষর। তাই একজন পুত্র হিসেবে আমি মনে করি, বাবার সাহিত্যজীবনের মূল্যায়নে এই একটি গ্রন্থই তাঁর নামকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখার জন্য যথেষ্ট। বাবার সাহিত্যজীবন অবশ্য এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘মেঘমল্লার’ উপন্যাস, ‘আলিবাবা চল্লিশ চোর’-এর উর্দু থেকে বাংলা রূপান্তরসহ বিভিন্ন গ্রন্থ অনুবাদ ও রূপান্তরের কাজ তিনি করেছেন। বাংলা, উর্দু, হিন্দি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষার ওপর তাঁর দখল ছিল বিস্ময়কর। অথচ এত প্রতিভা ও পরিশ্রমের পরও তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ—নীরবে কাজ করে যাওয়াই যেন ছিল তাঁর স্বভাব। আমরা ভাই-বোনেরা আজও একটি আক্ষেপ বয়ে বেড়াই। আমাদের দাদা ভোলার শহরের প্রাণকেন্দ্র কালীবাড়ি রোডে পুকুরসহ যে বড় বাড়িটি রেখে গিয়েছিলেন, ১৯৪৭ সালে ভবিষ্যতের সন্ধানে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাবা সেখান থেকে চলে আসে। পরবর্তীকালে আর্থিক দৈন্যতা ও নানা বাস্তবতার সুযোগে সেই পৈতৃক ভিটা আমাদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের নাগালের বাইরে চলে যায়। আজ সেখানে আমাদের শিকড়ের স্মৃতি আছে, কিন্তু আমাদের সেই শিকড়ের স্পর্শ নেই। এই বঞ্চনার কষ্ট হয়তো কখনো পুরোপুরি মুছে যাবে না। তবু আমরা গর্বিত—কারণ আমাদের শিকড় শুধু একটি বাড়ির মাটিতে নয়; আমাদের শিকড় একজন সৃষ্টিশীল, জ্ঞানী ও সাধক মানুষের জীবনে। আমাদের বাবা তাঁর কলম, মেধা ও শ্রম দিয়ে যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। বিশ্ব বাবা দিবসে বাবাকে স্মরণ করে আমি লিখেছিলাম—‘বাবা হলো সন্তানদের জন্য পরম স্নেহে লালিত অনিবার্য একটি ছাতা।’ বাবা আজ আমাদের মাঝে নেই। ২০০১ সালের ২ এপ্রিল তিনি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। কিন্তু তাঁর স্নেহ, তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর মমতা, তাঁর সাহিত্যসাধনা এবং তাঁর রেখে যাওয়া অমূল্য কর্ম আজও আমাদের হৃদয়ে অম্লান। আমি তাঁর মেজো ছেলে আফতাব আনোয়ার—আজও গভীর গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, আমি কথাশিল্পী আবুল কালাম মুস্তাফার সন্তান। বাবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা কোনো একটি দিবসের জন্য নয়; এটি সারাজীবনের। আল্লাহ আমার প্রিয় বাবাকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। বাবা, আপনি আমাদের মাঝে নেই—কিন্তু আমাদের হৃদয়ে আপনি চির অম্লান। আমিন। 🤲
আমার কাছে আমার বাবা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক।