

পুরনো দিনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে। ঠাকুরমার ঝুলি আর দাদুর মুখে রাজা রানীর গল্প শুনে ইচ্ছে হয় সেই সময়ের গল্প বলতে। নবাবী আমল, মহলের কূটচাল, বিলাসী জীবন এই নিয়ে গল্প বলা হয়েছে ঢের। তাই আমি সমাজের উঁচুতলার মানুষগুলোকে এড়িয়ে যেতে চাই। যা কিছু ঠাই পেয়েছে ইতিহাসে তার পাশ কাটিয়ে গিয়ে একটা গল্প বলা যায়না? খুব সাধারণ, ছিমছাম একটা গল্প! পাষাণ হৃদয়ের রানী, নির্মম রাজার সাথে পরিচিত না হয়ে মজনু, হাবীবার মায়াবী জীবনের গল্পটা বলেছি শুধু। নবাব সরজ খাঁ, মজনু শাহ, বহরাম, ইব্রাহীম দালি, জিয়াউদ্দিন বারণি এরা আমাদের সময়ের মানুষ নন, অথচ তাদের সাথে আমার গভীর সখ্যতা! চলতে ফিরতে লেখার সময়ে দীর্ঘ সময় ধরে আড্ডা দিয়েছি চরিত্রগুলোর সাথে। সেই সময়ের ঘরবাড়ি, আসবাব, মানুষের পোশাক, দেয়াল, রং এইসব আঁকতে গিয়ে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। তথ্য কোথায় পাবো? সুলতানি আমল, মুঘল আমল নিয়ে ঘাটাঘাটি করে পাওয়া যায়না সাধারণ মানুষের কথা তেমন। তবে হ্যাঁ চারপাশের পরিবেশটা টের পাওয়া যায় অল্প করে। হালকার ওপর ঝাপসায় বোঝা যায় বাড়িটা কেমন ছিলো, পোশাক, খাবার এমন আর কি! তা দিয়ে উপন্যাস আগানো কঠিন। অতঃপর চোখ বন্ধ করি। কল্পনায় হাতড়ে বেড়াই মজনু, ঝুমকির জীবন। খুব বেশিদূর না যেতে পারলেও থেমে থাকতে হয়না। 'মকবরা' ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়। ইতিহাসের কাছে হাত পেতে সেই সময়ের সাধারণ মানুষদের জীবনকে তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে শব্দ আর বাক্যের বুননে বন্দী করে। 'মকবরা' মানে কবর। কবরের চারপাশটায় যে বিষণ্নতা ঘিরে থাকে সেই হাহাকার গল্পের পুরোটা সময়জুড়ে থাকুক এমন চেষ্টাই করেছি আমি। এটা জানা জরুরী যে, 'মকবরা' প্রাসাদ নয় কুড়েঘরের গল্প। অই ইতিহাসে রাজা, কোতোয়াল, সেনাপতি নিয়ে বরাবরই যে আলাপ হয় তাকে ভুলে যাবার মিছে চেষ্টা করেছি। আমার আগ্রহ ছিলো শুধু প্রাসাদ থেকে মাইলখানেক দূরে থাকা কুড়েঘরের সামান্য, অসহায় মানুষগুলোর জীবন নিয়ে। তার, তাদের কথা ইতিহাসে নেই। বঞ্চিত এই মানুষগুলোর কথা বলা দরকার। বলেছি। সামান্য করে। আড়ালে থাকা বইটি আলোর মুখ দেখতে পাবে অনেকদিন পর এই খবর আনন্দের। আগের প্রকাশনীতে আউট অব স্টক ছিলো বইটি। শ্রদ্ধেয় প্রকাশক নজরুল ইসলাম বাহার ভাই এগিয়ে এলেন বইটি প্রকাশ করার জন্য। 'মকবরা', বাঘবিধবা, জলপরানি এই তিনটি বই নিয়ে আগ্রহ তার। নিজেই সময় নিয়ে 'মকবরা' বইটির পান্ডুলিপি পড়েছেন। বড্ড মমতা নিয়ে বইটি তিনি সকলের কাছে সহজলভ্য করার চেষ্টা করছেন। ভালো কাগজ, স্পট লেমিনেশন, অ্যামবুশ এইসব হাবিজাবি করে বইয়ের সৌন্দর্য্য বাড়ানোর জন্য তার কঠিন চেষ্টা দেখে অবাক হয়েছি। মুগ্ধ করার মতোন প্রচ্ছদ করেছেন তথাগত তৃত। ঋণী হয়ে থাকলাম। দিনে দিনে পাঠক বেড়েছে সামান্য এই লেখকের। বড় অংশের এই পাঠকরা পরিচিত হোক 'মকবরা' বইয়ের পৃথিবীর সাথে এটাই একমাত্র চাওয়া। মজনু, হাবীবা, ঝুমকি আপন হোক। আগলে রাখুক পাঠকরা তাদের। বিষণ্ন হোক, মন উচাটন হোক, ভালোবাসুক।