

Published
February 20, 2022
Language
বাংলা
Pages
256
Published by
বইটই“মৌরীর জন্য আমার ভেতরে কতখানি ভালোবাসা লুকোনো ছিল, ওর সঙ্গে আজ দেখা না হলে কোনোদিনই অনুভব করতে পারতাম না। ওকে একপলক দেখলাম, একটিমাত্র ঝলক, অমনি আমার মহাসমুদ্র উথালপাথাল গর্জনে জেগে উঠলো। আমি ভেতরে ভেতরে ভাবালুতার অতলান্ত গহ্বরে ডুবে গেলাম, হারিয়ে গেলাম। এতদিন ওকে না দেখে, ওর কাছ থেকে নিজেকে দূরে রেখে কীভাবে বেঁচে থাকলাম! এই বেঁচে থাকা আমার কাছে এক মহাবিস্ময় মনে হলো। মনে হলো, সেই কত যুগ আগে, সেই কত শতবর্ষ আগে আমি শেষবার মৌরীকে দেখেছিলাম, তারপর অকস্মাৎ একদিন জীবন থেকে মৌরী হারিয়ে গিয়েছিল, কিংবা হয়ত আমিই মৌরীর কাছ থেকে নিজেকে আত্মগোপনবাসী করে রেখেছিলাম, কিংবা কে জানে, হয়ত-বা মৌরী নিজেই আমার কাছ থেকে ওকে আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল। আজ মনে হলো, আশ্চর্য, আগে কখনো এমন মনে হয় নি, আজ মনে হলো, শেষবার মৌরীকে দেখার পর আমি ওকে কত খুঁজেছি- পাহাড়, সমুদ্র, অরণ্য, মহাকাশ, সারা ‘বিশ্ব-সংসার তন্ন তন্ন করে’ খুঁজেছি। আকুল হয়ে যখন হাঁপিয়ে উঠেছি, ঠিক তখনই, মনে হলো আচমকা আমার সামনে এসে মৌরী দাঁড়ালো। মনে হলো, আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত, শুষ্ক মরুর বুকে তপ্তবুক-পিপাসার্ত আমি, আমার সাধ হলো মৌরীকে সাপটে ধরে বুকে জড়িয়ে নিই; মনে হলো, ওকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করলেই আমার এতদিনের তৃষ্ণার্ত বুক শীতল হবে।” স্কুলজীবনের ক্লাসমেট কফিলের সাথে দেখা করবার দরকার ছিল। ওর সাথেও বহুদিন দেখা নেই। মেঘুলা বাজার হয়ে কবি নজরুল গার্ল্স হাইস্কুলের উত্তর দিকের পথ ধরে করিম হেঁটে যাছে কফিলদের বাড়ির দিকে। পথের দু ধারে আম, জাম, কড়াই, কাঁঠাল, নাম-ভুলে-যাওয়া আরো হরেক রকম লম্বা গাছের সারি, ঘন ডালপালা আর পত্র-পল্লব ছাতার মতো ছেয়ে দিয়েছে শিমুলিয়া গ্রামের সরু পথ। কখনো সখনো দুয়েকটি ডোবা- বৃষ্টির পানিতে ভরে গেছে, ব্যাঙের দাপাদাপি। ঝিল্লির তীক্ষ্ণ স্বর। ওর মনে কোনো নারী কিংবা যুবতীর জন্য ভাবনা ছিল না। আনমনে কখনো বৃক্ষ-তরুর ছাতার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল - বৃষ্টিবিধৌত আকাশ কত সুনীল, খণ্ড খণ্ড শাদা মেঘের বিক্ষিপ্ত ওড়াউড়ি, প্রখর সূর্য, কখনো দৃষ্টি ফেরাই পথের দু পাশে- ডোবার পানিতে ব্যাঙাচির কিলবিল, দুয়েকটা পাখি উড়ে উড়ে এ-ডাল থেকে ও-ডালে যায়, পিটপিট করে তাকায়, বাতাসে খসে পড়া পাতা টুপ করে মাথায় পড়ে - গড়িয়ে ঘাড়ে নামে, নরম সুড়সুড়ি দিয়ে নীচে পড়ে যায়। কখনো পথের উপরে গর্ত, পানি জমে আছে, এখানে-ওখানে কাদা, ছোটো ছোটো লাফে সেই কাদা পার হই, পিছলে মৃদু ভারসাম্য হারিয়ে পা ফসকে পড়ে যায়, আবার সামলে ওঠে - ঠিক তখনই সামনে টুন করে রিকশার ঘণ্টা বেজে উঠলো, আর করিম চমকে থেমে দেখলো, মোহন ভঙ্গিমায় রিকশায় বসে উজ্জ্বল মিষ্টি হাসছে অপরূপা যে মেয়েটি - সে মৌরী। মৌরীর ইশারায় রাস্তার একপাশে রিকশা দাঁড়ালো। করিম নিজের অস্তিত্ব ভুলে গেল; নিজের উপস্থিতি বিস্মৃত হলো; সে নিশ্চয়ই এ মুহূর্তে কাদা-মাটির মর্ত্যে দাঁড়িয়ে নেই; ওর চতুর্পার্শ্বে যে-সব গাছপালার বন-বাদাড় ছিল, তা-ও নিশ্চয়ই সত্য নয়; সে আছে এমন এক স্বর্গের বাগানে যেখানে ফুটে আছে রাশি রাশি সুগন্ধি ফুল, যার স্নিগ্ধ সৌরভে চারদিক মাতোয়ারা। সে কি মৌরীর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে? করিম যেন ঠিক হারিয়ে গেল। এরপর গল্প এগিয়ে যায়। করিমের সামনে উঠে আসে এক সুন্দর, অদ্ভুত শৈশব, কৈশোর ও উচ্ছল স্কুলজীবনের দিনগুলো, যেখানে সে হারিয়ে এসেছে মৌরী, প্রমীলা, জুঁই, এবং নাম-ভুলে-যাওয়া আরো অনেক সহপাঠিনীকে; হারিয়ে এসেছে প্রাণখোলা, দরদিয়া অনেক বন্ধুকেও। মূলত সেই মেয়েটি, মৌরী, কিংবা জুঁই, অথবা প্রমীলা, যে তার সমগ্র অন্তর জুড়ে আছে, সে এখন কোথায়, কীভাবে আছে, চঞ্চলতায় ভরপুর রোমাঞ্চ-মধুর-বিধূর সেই গল্পকে নিয়েই খলিল মাহ্মুদের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অন্তরবাহিনী’ লেখা হয়েছিল।