

ফিরে আসা পরী(পরীর সাথে প্রেম)২য় সিকুয়েন্স #রাইটারঃSohel_Rana #সংগ্রহীতাঃনাদিয়া(এডমিন প্যানেল) পর্ব–{৩-৪(শেষ)} #পর্ব–৩ অনেক্ষণ ধরে শিমু আমাকে আড়াল করে দুষ্ট জীনগুলোর বিরুদ্ধে লড়লো। সে এবার হাঁপিয়ে উঠেছো। তবুও আমাকে বাঁচানোর জন্য লড়ে যেতে যাচ্ছে। ঐদিকে কয়েকটা দুষ্ট জীন সালেহীনকে খুব মারতেছে। সালেহীনের অবস্থা খুব করুণ। এভাবে আর কিছুক্ষণ মার খেলে সে মারা যাবে। সেও ওদের মারার চেষ্টা করতেছে, কিন্তু ওদের বিরুদ্ধে পেরে উঠছেনা। একসময় ঢলে পড়লো সালেহীন। শরীরের সমস্ত শক্তি তার ফুরিয়ে এসেছে। আমি তার নাম ধরে চিৎকার করে উঠলাম: --সালেহীন....." সালেহীন চোখ খুলে একবার আমাকে দেখলো, আরেকবার শিমুকে দেখলো, তারপর চোখ বুজে ফেললো। আমি সালেহীনের কাছে গিয়ে ওকে স্পষ্ট করার চেষ্টা করলাম। তখন দুষ্ট জীনগুলো আমাকে ধরে মারতে লাগলো। হঠাৎ আমার মুখ দিয়ে জোরে একটা চিৎকার বের হলো। অথচ আমি কোনো চিৎকার দিইনি। সেই চিৎকার শুনে থমকে দাঁড়ালো দুষ্ট জীনগুলো। পিছু হটতে শুরু করলো। আমি ধীরে ধীরে ঠের পাচ্ছি আমার মাঝে একটা অজানা শক্তি ভর করছে। আমার চোখ থেকে কয়েকটা জ্যোতি রেখা বেরিয়ে দুষ্ট জীনগুলোকে ঘিরে ফেললো। শিমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। খারাপ জীনগুলোও অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো আমাকে: --কে তুমি? এতো শক্তি পেলে কোথায়? প্লিজ তোমার চোখের ঐ জ্যোতিটা বন্ধ করো। আমরা সহ্য করতে পারছিনা।" ওদের কথা শেষ হতেই আমি সালেহীনের লাশের দিকে একবার তাকালাম। নিষ্পাপ চেহারাটা তার শান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে। ওরা তাকে বাঁচতে দেয়নি। ওদেরও বাঁচার অধিকার নেই। . . বিস্ময় কাটিয়ে শিমু আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। তারপর ওদের দিকে ইশারা করে বললো: --রানা, ওরা তোমার বন্ধুকে মেরে ফেলেছে। তুমিও ওদের শেষ করে দাও তোমার শক্তি দিয়ে।" --হুমমম শিমু, ওদের বাঁচতে দেয়া যায়না। ওদের কারণে আমি হারিয়েছি আমার এক ভালো বন্ধুকে।" বলেই আমি আমার সমস্ত অজানা শক্তি প্রয়োগ করলাম দুষ্টজীনগুলোর উপর। চোখ এবং হাতের তালু থেকে আলোকরশ্মি বেরিয়ে ওদের উপর পড়লো। তার তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে ওরা চিৎকার করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর ওদের চিৎকার থেমে গেলো। ঢলে পড়লো ওরা নিচে। ওরাও সঙ্গী হলো সালেহীনের। . . তারপর আমি আর শিমু গেলাম সালেহীনের লাশের পাশে। কেন জানি খুব কষ্ট হলো ওর লাশটা দেখে। ওর লাশটাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদলাম। শিমুর চোখেও জল বেরিয়ে এলো। আমি তাকে বললাম: --শিমু, বেচারা তার মনের কথাটা তোমাকে বলে যেতে পারলোনা। --কি তার মনের কথা?" অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো শিমু। --ও তোমাকে অনেক ভালোবাসতো।" নরমকণ্ঠে জবাব দিলাম আমি। --কি বলছো এসব?" শিমু যেন বিশ্বাস করতে পারছেনা। --হ্যা শিমু, সত্যি, ও তোমাকে অনেক ভালোবাসতো। কিন্তু কখনো মুখ ফুটে বলতে পারেনি। শুধু আমাকে বলেছে। অনেকদিন ধরে ও তোমাকে মনে মনে ভালোবেসে এসেছে। সে ভালোবাসার কথা আর কখনো বলা হয়ে উঠবেনা।" শিমু আবেগে আর থাকতে পারলোনা আর। সালেহীনের লাশ জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কান্না করলো। তারপর তার লাশটা ঝাকিয়ে বলতে লাগলো: --এই সালেহীন এই, এতোই যখন ভালোবাসতি একবারো বলতে পারলিনা আমাকে? কি হলো কথা বলছিসনা কেন? ও তুইতো আর কথা বলবিনা, ঘুমিয়ে পড়েছিস তুই। ঘুমানোর আগে কেন তুই একবার বললিনা, তুই আমাকে অনেক ভালোবাসিস? কেন বললিনা? কেন?" জোরে চিৎকার করে উঠলো শিমু। আমি তাকে বললাম: --শিমু শান্ত হও তুমি। সালেহীনের লাশ কষ্ট পাবে এতে। ওর সমাধি করা দরকার এখন। --হুমমম.... তাই করো।" চোখের জল মুছে বললো শিমু। . . রাতে শিমুকে মন খারাপ করে বাইরে বসে থাকতে দেখে, আমি গেলাম তার পাশে। জিজ্ঞেস করলাম: --মন খারাপ? --হুমম.....সালেহীনের জন্য মনটা খুব কাঁদছে।" জবাব দিলো শিমু। --আমারো খুব কষ্ট হচ্ছে তার জন্য। সে আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার স্মৃতিগুলো যেন এখনো জীবন্ত। মনে হচ্ছে যেন সালেহীন আমাদের পাশে আছে। সব শুনতে পাচ্ছে সে। --আচ্ছা রানা, একটা প্রশ্ন করি? --করো? --তুমি কি করে ঐ খারাপ জীনগুলোকে শায়েস্তা করলে? --আমি জানিনা। আমার শরীরে একটা অদৃশ্য শক্তি ভর করেছে। মনে হয় জেরিন ফিরে এসেছে...... . . --জেরিন কে?" অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো শিমু। --আমি জেরিন...." পেছন থেকে হঠাৎ একটা মেয়েলী কণ্ঠস্বর শোনা গেলো। চমকে তাকালাম আমি আর শিমু। দেখলাম ডানামেলে দাঁড়িয়ে আছে জেরিন। তাকে দেখে আমার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। বললাম: --জেরিন, তুমি এসেছো?" জেরিন আমার আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আমার বুকে মাথা রাখলো। তারপর বললো: --হুমমম.... এসেছি রানা......" --আমি জানতাম তুমি আসবে। --আমার ভালোবাসা এখানে আটকে আছে, আমি কি না এসে পারি বলো? শুধু অমাবস্যা রাতের জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। --এখানে তো পূর্ণিমা রাত। তাই বুঝিতেছিলাম না, আমাদের জগতে অমাবস্যা নাকি পূর্ণিমা। যাইহোক, তুমি এসেছো বেশ করেছো। এসো তোমার সাথে শিমুর পরিচয় করিয়ে দিই।" বলেই শিমুর দিকে ইশারা করে বললাম: --ও শিমু, ও আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে বিয়ে করবে বলে। কিন্তু ও হয়তো এখন তার ভুল বুঝতে পেরেছে।" তারপর জেরিনের দিকে ইশারা করে শিমুকে বললাম: --আর শিমু, ও হচ্ছে জেরিন, আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম, আমার সবকিছু। আমি ওকে ভালোবাসি। কিন্তু কি জানো? আমাদের মধ্যে অনেক ব্যবধান। ও এখন অশরীরী। ঐ রাতে তুমি আমাকে উড়তে দেখেছো, তখন আসলে ওর সাথে আমি উড়েছিলাম। ও যাকে দেখা দেবে, শুধু সে-ই দেখতে পাবে ওকে।" --হুমমম....বুঝলাম। কিন্তু ও অশরীরী হলো কেমনে?" প্রশ্ন --হুমমম....বুঝলাম। কিন্তু ও অশরীরী হলো কেমনে?" প্রশ্ন করলো শিমু। তারপর আমি শিমুকে সব ("অলৌকিক প্রেম" দ্রষ্টব্য) খুলে বললাম। সব শুনে শিমু আফসোস করে বললো: --তোমরা তো তবুও একে অপরকে ভালোবাসতে পেরেছো? কিন্তু আমি? আমি তো সালেহীনের ভালোবাসা বুঝতেও পারিনি কখনো। সালেহীন আমাকে ভালোবাসতো, কথাটি কখনো সে আর বলতে পারবেনা। ওরা ওকে বাঁচতে দেয়নি।" বলতে বলতে শিমু হু হু করে কেঁদে উঠলো। আসলে কাছে থাকলে কারো ভালোবাসা বুঝা যায়না। যখন হারিয়ে যায় তখন বুঝা যায় ভালোবাসা কি..... শূন্যতা তখন বারবার হৃদয়ে আঘাত হানে, আর জানিয়ে দেয় কেউ একজন তাকে খুব ভালোবাসতো। তেমনি আমারো হয়েছিলো, যখন আমি জেরিনকে হারিয়েছিলাম......." . . শিমুকে কাঁদতে দেখে জেরিন তার কাঁধে হাত রেখে বললো: --শিমু, তুমি কি সালেহীনকে ভালোবাসো? --এখন ভালোবেসে কি হবে? ও তো নেই।" কাঁদতে কাঁদতে জবাব দিলো শিমু। --মন থেকে তাকে ডাকো, নিশ্চয়ই একদিন তোমার ডাকে তার আত্মা সাড়া দেবে। এই আমি যেমন রানার ডাকে সাড়া দিয়েছি।" --বেশ, আমিও আজ থেকে সালেহীনের প্রত্যাশা করে যাবো। --হুমমমম তাই করো। সালেহীনের হৃদয়টা অতৃপ্ত। নিশ্চয়ই আসবে সে। --তাই যেন হয়....." বলেই শিমু আমার দিকে তাকালো। তারপর বললো: --রানা, আমি দুঃখিত। আমি না বুঝে তোমার উপর অন্যায় করে ফেলেছি। --না ঠিক আছে। তুমি এই অন্যায়টা করেছো বলেই, আমি কিছুদিনের জন্য হলেও সালেহীনের মতো একটা বন্ধু পেয়েছিলাম।" শিমুকে সান্ত্বনা দিলাম আমি। এরপর জেরিন বললো: --রানা, এবার সময় এসেছে প্রতিশোধ নেয়ার, যাদের কারণে আমার মৃত্যু হয়েছে তাদের শেষ করবো। --হুমমম..... কিন্তু কীভাবে শেষ করবা কিছু ভেবেছো? --আমি তোমার উপর ভর করবো। তোমার মাঝেই আমার শক্তি থাকবে। তারপর ওদের তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারবো। --আচ্ছা ঠিক আছে।" মাথা নেড়ে সায় দিলাম জেরিনের কথায়। তখন শিমু বললো: --আমি কি তোমাদের সাহায্যে আসতে পারি?" --হুমমম..... প্রয়োজনে তোমার সাহায্যও লাগবে আমাদের।" শিমুর কথার জবাবে বললো জেরিন। --আচ্ছা, আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে তোমাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো।" শিমু চোখ মুছে বললো। --ধন্যবাদ তোমাকে শিমু।" আমি আর জেরিন তার প্রতি কৃতজ্ঞ হলাম। . . একটা প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর শিমু। কিছুটা আড়াল থেকে লক্ষ্য করতেছি ভেতরে কে যাচ্ছে আর বের হচ্ছে। বলে রাখা ভালো, প্রাসাদটা আমার শত্রুর। মানে যার কারণে আমি হারিয়েছি আমার জেরিনকে। . . আমার মাঝে এখন দুইটা শক্তি, একট মানুষের, অন্যটা অশরীরীর। কারণ জেরিন ভর করেছে আমার উপর। যাইহোক, প্রাসাদটার ভেতরে উকি দিচ্ছিলাম। দেখলাম একটা জীন তার কোলের বাচ্চাকে আদর করতেছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার স্ত্রী। আমার টার্গেট ঐ জীনটা। সে আমার জেরিনের জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। সহজে ছাড়া যাবেনা। . . জেরিন আমার উপর ভর করে সব ইঙ্গিত দিচ্ছে কি কি করতে হবে, সে-ই আমায় জানিয়ে দিয়েছে ঐ জীনটার পরিচয়। নাম ইয়াজিদ। এই প্রাসাদেই থাকে স্ত্রী পুত্র নিয়ে। ক্ষমতাধর জীনদের মধ্যে সেও একজন। শিমু আরো খোঁজ নিয়ে এই জীনটা সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছে। জেরিনের মৃত্যুর পর সে বিয়ে করে অন্য একটা পরীকে। এখন একটা বাচ্চা হয়েছে। . . কিছুক্ষণ পর ইয়াজিদের কাছে এলো আরো কয়েকজন জীন। তারা ইয়াজীদের সাথে কথা বলতে লাগলো। আর ইয়াজীদের স্ত্রী বাচ্চাকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। জেরিন আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে এরাও শত্রু। আপাতত শত্রুগুলোকে চিনে রাখলাম। ধীরে ধীরে শেষ করতে হবে। . . রাত নেমেছে জীনপরীর দেশে। চাঁদটা উজ্জ্বল আলো দিচ্ছিলো। আমি আর শিমু এলাম একটা আস্তানায়, এখানে ইয়াজীদের সঙ্গীরা থাকে। ওদের পিছু নিয়ে এসেছি আমরা। আমি শিমুকে বললাম: --শিমু, যাও তুমি.... ওদের সামনে যাও। --কিন্তু আমার ভয় করে....." কিছুটা কেঁপে জবাব দিলো শিমু। --ভয় পেয়োনা। আমি আছি, আর সাথে আছে জেরিনের শক্তি। --ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি।" বলেই শিমু পা বাড়ালো ভেতরে। আমি বাইরে থেকে কাঁন পাতলাম ভেতরের কথা শুনার জন্য। শিমুকে দেখে প্রথমে ওরাই জিজ্ঞেস করলো: --কে আপনি?" শিমু জবাব দিলো: --আমার নাম শিমু, হঠাৎ আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমি কি একটু আশ্রয় পেতে পারি?" দুষ্টজীনগুলো এককথায় রাজি হয়ে গেল। একা একটা সুন্দরী পরীর আবদার কি তারা না রেখে থাকতে পারে? আমি জানি একটু পর ওরা শিমুর উপর সবাই মিলে ঝাপিয়ে পড়বে। আর আমিও প্রস্তুতি নিলাম ওদেরকে প্রথম আঘাতটা করার জন্য। . . আস্তানার দরজা বন্ধ হয়ে গেল। একটু পর শিমুর চিৎকার শুনা গেল: --একি করছেন আপনারা? আমি আশ্রয় নিয়েছি বলে আপনারা কী শুরু করেছেন আমার উপর? দুষ্ট জীনগুলো তখন "হা হা হা" করে উঠলো, যেন খুব মজা পেয়েছে তারা শিমুর কথা শুনে। আমি বুঝলাম সময় এসেছে এবার প্রথম আক্রমণটা করার। চোখ দিয়ে ইশারা করলাম আমি, সাথে সাথে খুলে গেল আস্তানার দরজা। আমাকে ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে গেল দুষ্ট জীনগুলো। জিজ্ঞেস করলো: --কে তুই মানবসন্তান? এখানে এলি কি করে?" আমি একটা বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বললাম: --একটা পরীকে একা পেয়ে সবাই মিলে কি করতেছিস লজ্জা করেনা?" একটা দুষ্ট জীন তখন বললো: --তোর সাহস দেখে আমরা অবাক হচ্ছি। জানিস আমরা মানব সন্তানদের দেখতে পারিনা, আর তুই নিজে আসলি আমাদের আস্তানায়? এতো সাহস তোর? --সাহসের এখনো কি দেখলি? আমি যখন এসেছি, তখন প্রতিটা মুহূর্ত তোদের ভয়ে ভয়ে কাটবে। --তাই নাকি??" সব জীনগুলো একসাথে "হা হা হা" করে উঠলো। তারপর তারা আমার দিকে এগিয়ে এলো আমাকে মারার জন্য। আমি তখন চোখ দিয়ে ইশারা করলাম শুধু, ছিটকে তারা দূরে গিয়ে পড়লো। তারপর আমার ইশারায় ওরা একজন আরেকজনকে মারতে লাগলো। আমি আর শিমু তখন মজা নিচ্ছিলাম ওদের অবস্থা দেখে। অনেক্ষণ এভাবে চলার পর আমি অশরীরী শক্তিটা থামিয়ে দিলাম। ওরাও থামলো পরস্পরের সাথে মারামারি করে। হাঁপিয়ে উঠেছে তারা। আমি এগিয়ে গেলাম তাদের দিকে। বিদ্রুপ করে জিজ্ঞেস করলাম: --আহারে, যুদ্ধ করে খুব কষ্ট হয়েছে বুঝি? এখন একটু রেস্ট নাও।" ওরা তখন ভয় পেতে শুরু করলো আমাকে। সবাই একসাথে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো: --কে আপনি?" --আমি মানব সন্তান। তোমাদের মতো দুষ্ট জীনদের শেষ করতে এসেছি। --আমাদের কী অপরাধ? --সেটা পরে জানতে পারবে। আজ থেকে প্রতিটা মুহূর্ত মৃত্যু ভয়ে কাটাবে তোমরা। আর তোমাদের ইয়াজিদকে জানিয়ে দেবে, একজন মানব সন্তান এসেছে তাকে শেষ করার জন্য। তাকে প্রস্তুত থাকতে বলবে।" বলেই আমি শিমুকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। দুষ্টজীনগুলো তখনো ভয়ে কাঁপতেছিল। হয়তো ভাবতেছে, একটা মানবসন্তান হয়ে তাদের এভাবে শায়েস্তা করে গেল? এতো শক্তি তার?" . . অচিরেই পৌঁছে গেলো খবরটা ইয়াজিদের কানে। একটা মানব সন্তান এসে তার সৈন্যদের নাজেহাল করে গেছে। ছিঃ! কী লজ্জা! কী লজ্জা! এই লজ্জাটা ইয়াজিদের মাথায় আগুণ ধরিয়ে দিলো। তাই সেই রাতেই ইয়াজিদ তার সৈন্য নিয়ে খুঁজে বের করলো আমাদের। আমরা তখন বাইরে বসে কথা বলছিলাম। হঠাৎ এলো ওরা। সবার সামনে ছিল ইয়াজিদ। বাকিরা তার পেছনে জড়োসড়ো হয়ে ছিল। কারণ আমার শক্তি সম্পর্কে ইতোমধ্যে তাদের ধারণা হয়ে গেছে। . . হঠাৎ ইয়াজিদ চিৎকার করে বললো: --কে? কে তোমাদের এমন নাজেহাল করলো? কে সেই মানব সন্তান?" আমি তখন ইয়াজিদের সামনে গেলাম। তার গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে বললাম: --চোখ বড় বড় করে দেখে নাও আমাকে....." . . চড়টা খেয়ে ইয়াজিদ কিছুক্ষণ ঢুলতে লাগলো। তারপর আমাকে মারার জন্য হাত তুললো সে। কিন্তু মারতে পারলোনা। হাত কাঁপতে লাগলো তার। তার চেহারা দেখে বুঝা গেলো সেও ভয় পেয়েছে কিছুটা। তার সঙ্গিরা পেছন থেকে বলতে লাগলো: --ভাই, আমরা আগেই বলেছিলাম এ কিন্তু যেই সেই মানবসন্তান না। ওর অনেক শক্তি।" সঙ্গিদের কথা শুনে ইয়াজিদ আরো বেশি ভয় পেয়ে বললো: --কে তুমি?" --আমার পরিচয় তো এতো সহজে পাবিনা। তবে এটা জেনে রাখো, আমি তোর মৃত্যুদূত হয়ে এসেছি। আজ থেকে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাক।" ভয় পেয়ে তখন চলে গেল ইয়াজিদ ও তার দল। আমি জানি সে এখন আমাকে মারার উপায় খুঁজতে থাকবে। . . ইয়াজিদরা চলে যাওয়ার পর জেরিন এলো সামনে। আমার পাশে বসলো কাঁধে মাথা রেখে। শিমু মুখ নিচু করে কান্না করছিলো। হয়তো সালেহীনকে মনে পড়তেছে তার। তাকে বাঁধা দিলামনা। কাঁদুক সে। কেঁদে মনটা হালকা করুক। বিষাদের গ্লানিসব ভেসে যাক চোখের জলে। --জেরিন....." হঠাৎ ডাক দিলাম জেরিনের নাম ধরে। --হুমমম...." অস্ফুটে জবাব দিলো জেরিন। মন খারাপ তার। --কথা বলছোনা কেন?" জিজ্ঞেস করলাম তাকে। --ভাবছি.... --কি ভাবছো? --ভাবছি, ইয়াজিদকে তাড়াতাড়ি শেষ করে দেবো। ওকে দেখলেই আমার সহ্য হয়না। --তাহলে তাই করো। --আর একটা দিন বেঁচে থাকুক সে। --আচ্ছা.... তুমি যা ভালো মনে করো, তাই হবে।" তারপর আমি শিমুকে জিজ্ঞেস করলাম: --শিমু, মন হালকা হয়ছে তোমার?" আমার প্রশ্ন শুনে শিমু কান্নায় ভেঙে।পড়লো। কান্না করতে করতে বললো: --রানা, আমার ভাগ্য কেন এমন বলতে পারো? সালেহীন আমায় এতো ভালোবাসতো? কেন আমি বুঝতে পারিনি? কেন? কেন? কেন? --কেঁদোনা শিমু। নিয়তিকে মেনে নাও। মনে রেখো, ভালোবাসা গোপনে আসে। আর তাকে যত্ন নিতে হয়।" আমার কথা শেষ হতেই জেরিন বললো: --শিমু, মন থেকে ডাকো ওকে। আসবে সে নিশ্চয়ই। তোমাকে আগেই বলেছি কথাটা। এভাবে কান্না করলে তার আত্মা কষ্ট পাবে। তুমি নিশ্চয়ই তার আত্মা কষ্ট পাক, তা চাওনা? আর তুমি এভাবে কান্না করো, তাও নিশ্চয়ই সে চায়না।" শিমু দু'চোখ মুছে বললো: --কী করবো আমি? কষ্ট সহ্য হয়না আমার। --কিছু কিছু কষ্টকে মানিয়ে নিতে হয় শিমু...." নরম সুরে বললো জেরিন। তার কথা শুনে শিমু কান্না থামিয়ে দিলো। . . পরের দিনটা কেটে গেল কোনমতে। কোনো ঝামেলা হয়নি। কিন্তু রাতে ইয়াজিদ এলো আরো বেশি দলবল নিয়ে। আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে বললো: --হে মূর্খ মানব, আমার দেশে এসে আমাকে মেরে যাবি, তা তুই ভাবলি কী করে? দেখ আজ কতো সৈন্য নিয়ে এসেছি। --সব সৈন্যের মরণ ডেকে আনলি তুই......" আমার ভেতর থেকে তখন জেরিনের আত্মা চিৎকার করে বললো।" জেরিনের কণ্ঠ শুনে চমকে উঠলো ইয়াজিদ। ভয়ে পিছু হটলো কিছুটা। তারপর ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো: --কে? কে তুমি? কণ্ঠ চেনা চেনা লাগে কেন?" জেরিন আবার বলে উঠলো: --চিনিসনি এখনো আমি কে?" --না... কে তুমি? সামনে আসো....." ভয়ে কাঁপতে লাগলো ইয়াজিদ। জেরিন তখন ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসলো সামনে। তাকে দেখেই চমকে উঠলো ইয়াজিদ। ভয়ে ভয়ে সে উচ্চারন করলো জেরিননননননন চলবে... #পর্ব–৪(শেষ) --চিনতে পেরেছিস তাহলে?" জেরিনের মুখে বিদ্রূপের হাসি দেখা গেলো। --হুমম, চিনতে পেরেছি.....কিন্তু তু...তুমি তো...." ইয়াজিদ কথা শেষ করতে পারলোনা। জেরিন গিয়ে তার গলা চেপে ধরে উপরে তুলে ফেললো। তারপর প্রচন্ড ক্রোধ নিয়ে বললো: --কিন্তু আমি মরে গেছি তাইতো? হুমম, মরে গেছি...... তোদের জন্য মরেছি, আমার ভালোবাসাকে না পেয়ে মরেছি। আজ আবার এসেছি তোদের উপর প্রতিশোধ নিতে, এসেছি আমার ভালোবাসার টানে। --কিন্তু জেরিন, আমি তো শুধু তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম....." বলতে বলতে নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো ইয়াজিদ। --তুই আমাকে আমার ভালোবাসার কাছ থেকে আলাদা করেছিস। আমার ডানা কেটে নিয়েছিস, আমাকে মারা যেতে বাধ্য করেছিস, আজ তোর পালা, তোকেও আজ মরতে হবে।" জেরিনের রাগ বেড়ে গেলো। ইয়াজিদ নিজেকে ছাড়াতে না পেরে তার সঙ্গিদের হেল্প চাইলো। তার সঙ্গিরা এতক্ষণ ভয়ে ভয়ে সব কান্ড দেখতেছিল। ইয়াজিদের আদেশ পেয়ে তারা জেরিনকে মারতে এলো। জেরিন চোখ থেকে কয়েকটা জ্যোতি বের করে দিলো ওদের দিকে। ওরা ছিটকে দূরে পড়লো। আমি বসে বসে মজা দেখছিলাম। এসব মারামারি আমার না করলেও চলবে। জেরিন একাই সবাইকে সাবাড় করতে পারবে। . . আমার বসে থাকাটা মনে হয় কয়েকটা দুষ্ট জীনের সহ্য হলোনা। তারা জেরিনকে কিছু করতে না পেরে আমাকে মারতে এলো। তাদেরকে বাঁধা দিলো শিমু। শিমু আমাকে আড়াল করে দাঁড়ালো। কিন্তু ওরা শিমুকে ধরে আঘাত করতে লাগলো। আরো কয়েকটা দুষ্ট জীন এগিয়ে আসতে লাগলো আমার দিকে। তখন জেরিন ইয়াজিদকে হাতের উপর চরকার মতো ঘুরিয়ে ছুড়ে মারলো ওদের দিকে। ওরা আর কাছে আসতে পারলোনা আমার। পড়ে গেল সবাই। যারা শিমুকে আঘাত করতেছিল, তারা এবার শিমুর ইজ্জতে হাত দিলো। আমি তখন জেরিনের উদ্দেশ্যে বললাম: --জেরিন, শিমুকে বাঁচাও......" জেরিন তখন শিমুকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে যেতে চাইলো। ঠিক তখনি একটা আলোকরশ্মি ঘূর্ণির মতো ঘুরে এগিয়ে যেতে লাগলো শিমুর দিকে। ওটা গিয়ে থামলো শিমুর পাশে। ধীরে ধীরে ওটা একটা জিনের আকৃতি নিলো। জিনটাকে দেখে আমি অস্ফুটে শব্দ করলাম: --সালেহীন....." মুখে হাসি ফুটে উঠলো। আমার। শিমুর মুখেও হাসি দেখা গেলো সালেহীনের আগমনে। সালেহীন তখন দুষ্ট জিনগুলোর হাত থেকে শিমুকে বাঁচিয়ে তাদের আঘাত করতে লাগলো। আর জেরিন ব্যস্ত হয়ে পড়লো তার শত্রুকে নিয়ে। ইয়াজিদ এবং তার অন্যান্য সঙ্গীকে সে ইচ্ছে মতো মারতে লাগলো। এতক্ষণেই আমি একটু আরাম করে বসতে পারলাম। শিমু বসলো আমার পাশে। জেরিন এবং সালেহীন শত্রু বিনাশে ব্যস্ত। পায়ের উপর পা তুলে দেখতে লাগলাম দুষ্ট জিনের করুণ পরিণতি। . . একসময় হাসিমুখে সামনে এসে দাঁড়ালো জেরিন এবং সালেহীন। শত্রুর বিনাশ হয়েছে ইতোমধ্যে। কিছুটা দূরে পড়ে আছে ওদের লাশ। সেদিকে আর তাকালাম না। আমি জড়িয়ে ধরলাম জেরিনকে, আর শিমু জড়িয়ে ধরলো সালেহীনকে। শিমু সালেহীনকে জড়িয়ে ধরেই কাঁদতে শুরু করলো, আর অভিযোগ করতে লাগলো কেন সে বলেনি ভালোবাসার কথা। সালেহীন শিমুকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো: --এইতো এসেছি আমি, তোমার সালেহীন তোমারই সামনে।" --কিন্তু তুমি তো বাস্তব নও, তুমি অধরা। আমি তো তোমাকে সবসময় পাবোনা।" শিমুর অভিযোগের শেষ নেই। সালেহীন বললো: --এই দূরত্বটা আছে বলেই আমাদের ভালোবাসাটা আজীবন থাকবে, দেখছোনা রানা এবং জেরিনকে। আমরাও নয় হয় ওভাবে থাকবো।" এবার জেরিন মুখ খুললো: --অটুট থাকুক তোমাদের এই ভালোবাসা। আমাদের কাজ শেষ এখানে। এবার আমরা ফিরে যাবো।" বিদায়ের কথা শুনে শিমুর ভেজা চোখদুটো আরো ভিজে উঠলো। সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো: --রানা, আজীবন মনে রাখবো তোমাকে। তুমি কি ভুলে যাবে আমায়?" আমি শিমুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম: --নাহ, ভুলবোনা আমিও। ভালো থেকো তোমরা। আমরা তাহলে যাই......" --শুভ বিদায়।" --বিদায়....." হাত নেড়ে বিদায় জানালাম ওদের। তারপর আমি আর জেরিন রওনা দিলাম পৃথিবীর উদ্দেশ্যে। . . উড়তে উড়তে আমরা যখন পৃথিবীর মাটিতে নামতে যাবো, তখন সামনে পড়ে গেলো ঐদিনের ঝুড়িওয়ালা। বেঁচারা অন্ধকারে লাইট জ্বালিয়ে ঐদিনের মতো মাথায় ঝুড়ি নিয়ে বাসায় যাচ্ছিলো ঢুলতে ঢুলতে, আর ছন্দ মিলিয়ে গান গাচ্ছিলো এভাবে: --মনেতে আমার শান্তি নাইরে বউ জালায় বারবার, ঝুড়িবন্ধন হয়না দেখে মদ ধরলাম আবার... হায়রে মদ ধরলাম আবার...." . . লোকটা তার গান শেষ করার আগেই আমরা মাটিতে নেমে দাঁড়ালাম। জেরিনকে দেখলোনা লোকটা। আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ালো সে। লাইটের আলো ফেললো সে আমার মুখের দিকে। তারপর মাতাল হয়ে ঢুলতে ঢুলতে জিজ্ঞেস করলো: --ভাই, আপনারে চেনা চেনা লাগে কেন? আর আপনি কীভাবে উড়ে আসলেন?" আমি লোকটাকে বললাম: --ঝুড়িবন্ধনের কথা মনে আছে?" --ও মনে পড়েছে.... আপনি ঐ লোকটা। ভাই আপনার সাথে যতবার দেখা হয়, ততবার এসব কি হয় আমার সাথে? ঐদিন আমার ঝুড়িটা ভাসতেছিলো শূন্যে, আজ দেখলাম আপনাকে উড়তে। এটা কি চোখের ভুল, নাকি সত্যি সত্যি? ভাই আপনাকে একটা চিমটি কেটে দেখি।" --আমাকে কেন চিমটি কাটবেন?" --ও তাইতো চিমটি তো নিজেকেই কাটতে হবে।" বলেই সে নিজেকে চিমটি কেটে বললো: --হায়! হায়! ভাই এটা তো সত্যি! আপনি কি সত্যি সত্যি উড়তে পারেন?" --তার আগে বলুন আপনি আবার খেয়েছেন কেন?" লোকটা হঠাৎ কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো: --দুঃখের কথা কী বলবো ভাই, ঐরাতের পর থেকে আমার শান্তি নাই। সেইরাতে বাসায় গিয়ে আমি বউকে বলেছিলাম যে, আমার ঝুড়ি কথা বলতে পারে। সে ফিমেইল। --তারপর? --তারপর বউ আমাকে পাগল ভেবে বললো: --ঝুড়ি আবার কথা বলতে পারে নাকি?" আমি বললাম, --দাঁড়াও তোমাকে চোখের সামনেই দেখাচ্ছি..." বলেই আমি ঝুড়িটাকে বললাম: --মা ঝুড়ি একটু কথা বলো তো মা। আমার বউ তোমার কথা শুনতে চাইছে, একটু দেখিয়ে দাও তুমিও কথা বলতে পারো....." কিন্তু এই ঝুড়ি তখন একটুও কথা বলেনি। আমার বউ সেই রাতে আমাকে খেতেও দেয়নি। পরদিন থেকে সবাইকে বলে বেড়িয়েছে আমি নাকি পাগল হয়ে গেছি। মনের দুঃখে তখন আমি শুধু ঝুড়িকে গালি দিতাম, আর মারতাম। ও কেন কথা বলেনি তখন?" বলতে বলতে কাঁদতে লাগলো লোকটা। আমি লোকটার কাঁধে হাত রেখে বললাম: --ভাই, আপনার ঝুড়িটা রাগ করে অনশন পালন করতেছিল হয়তো তখন, তাই কথা বলেনি। --কিন্তু এতদিনেও তো আমার ঝুড়ি একটুও কথা বলেনি আর, শুধু ঐরাতে বলেছিল। --কি করে কথা বলবে? আপনি তাকে এতো মেরেছেন, ঝুড়িটার বুঝি রাগ হয়না?" --ওমা তাইতো? আমার কী মনে হয় জানেন? --কী? --আমার মার খেয়ে আমার ঝুড়িটা মনে হয় বোবা হয়ে গেছে। আর কখনো কথা বলতে পারবেনা। হায়! আমি এ কী করলাম? নিজহাতে আমার ঝুড়ির কথা কেড়ে নিলাম?" লোকটার কান্না বেড়ে গেল। . . --আপনি মদ খাওয়া ছেড়ে দেন। নইতো ঝুড়িটা আবার ঝুড়িবন্ধন করতে পারে। এমনিতেই ঝুড়িটা বড্ড অভিমান করে আছে। তার উপর আপনি মদ খেয়েছেন, জানেননা ঝুড়িটা মদ খাওয়া পছন্দ করেনা?" লোকটাকে কাঁদতে দেখে বললাম আমি। লোকটা কান্না থামিয়ে বললো: --না ভাই, ঝুড়িটার ক্ষমতা নাই আর। ও আর কিছু করতে পারবেনা।" . . জেরিন এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। লোকটার কথা শেষ হতেই এবার সে ঝুড়িটা নিয়ে উপরে তুলে ফেললো। লোকটা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বললো: --হায়! হায়! আমার ঝুড়ি আজকেও শূন্যে ভাসতেছে।" আমি বললাম: --হুমমম..... এখন তো আপনার সর্বনাশ! আপনি আজকে আবার মদ খেয়েছেন, তাই ঝুড়ি রেগে গেছে। এখন ঝুড়িবন্ধন থেকে কেউ আপনাকে আর বাঁচাতে পারবেনা। --আমার ভুল হয়ে গেছে। এই কানে ধরলাম, আমি আর মদ খাবোনা কোনদিন।" আবারো কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলো লোকটা। --এখন ঝুড়িটার কাছে ক্ষমা চান আপনি।" --ঠিক আছে, ক্ষমা চাচ্ছি।" বলে লোকটা উপরে তাকিয়ে বললো: --মা ঝুড়ি, আমার ভুল হয়ে গেছে মা। ফিরে আয় মা।" উপর থেকে তখন জেরিন জবাব দিলো: --নাহ, তুমি পঁচা, তুমি মিথ্যে বলো, মদ খাও, আমাকে মারো। আমি আর আসবোনা তোমার কাছে।" --আমাকে শেষবারের মতো ক্ষমা করে দে মা। আমি সব ছেড়ে দেবো। তোমাকেও আর মারবোনা। --ঠিক তো? --হুমমম..... এবার আমার বউ মিথ্যে হয়ে যাবে, কিন্তু আমার কথার নড়চড় হবেনা। --বেশ, এবারের মতো ক্ষমা করলাম। ফিরে আসলাম আমি।" বলেই জেরিন ঝুড়িটা লোকটার মাথায় রাখলো আবার। লোকটা খুশি হয়ে বললো: --এবার বউকে মজা দেখাবো। আমার ঝুড়ি নাকি কথা বলেনা। এবার বউ বুঝবে মজা।" বলতে বলতে লোকটা চলে যেতে লাগলো। বেসুরা কণ্ঠে সে আবার গান গাওয়া শুরু করলো। ধীরে ধীরে তার গানের কণ্ঠ দূরে মিলিয়ে যেতে লাগলো। আমিও ফিরে এলাম বাসায়। . . এদিকে অনেকদিন আমার খোঁজ না পাওয়াই আমার পরিবারের সবাই টেনশনে ছিল। পত্রিকাতে একটা হারানো বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছিল আমার নামে। এখন হঠাৎ আমাকে ফিরে পাওয়াই সবার মুখে হাসি ফুটে উঠলো আবার। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করলো এতদিন কোথায় ছিলাম আমি। আমি জবাবে বললাম: --একটা পরী আমাকে ধরে নিয়ে গেছে....." এরপর সব খুলে বললাম আমি। খবরটা পরদিন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো। এর কান থেকে ওর কানে, ওর কান থেকে তার কানে যেতে যেতে একসময় খবরটা গিয়ে পৌঁছলো আমার হবু শ্বশুরবাড়ির সবার কানে। তারা তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, নাহ! এই ছেলের সাথে কিছুতেই তাদের মেয়ের বিয়ে দেয়া যাবেনা। এই ছেলের পেছনে জিনপরী আছে। না জানি আরো কি কি আছে। এই ছেলের সাথে বিয়ে হলে তাদের মেয়ের সর্বনাশ হবে। এই ভেবে আমার হবু শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বিয়েটা ভেঙে দিলো। আমারো আর বিয়ে করা হলোনা। সবার সামনে এমন ভান করতে লাগলাম, যেন বিয়েটা ভেঙে যাওয়াই আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি। মনে মনে যে অনেক খুশি হয়েছি, তা আর কাউকে বুঝতে দিইনি আমি। আমার জেরিন আছে, হোক সে অশরীরী, ভালোবাসা তো পাচ্ছি আমি। আর কী চাই আমার? . . আরো বেশ কয়েকটাদিন কেটে গেলো। একরাতে পুকুরঘাটে বসে আছি আমি আর জেরিন। জেরিনের মুখটা সেদিন মলিন ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম তাকে: --মন খারাপ? --হুমমম.... --কেন? --মনে হচ্ছে আমার বুঝি সময় ফুরিয়ে এসেছে। --মানে?" চমকে উঠলাম আমি। --মানে আমার চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, এবার তোমার জীবনে অন্য কেউ আসবে। --কি বলছো এসব?" --হুমমম, সেবার তোমার বিয়ে ভেঙে গিয়েছিলো। এবার আর ভাঙবেনা। --জেরিন তুমি কি ঠিক আছো? কার বিয়ে? কিসের বিয়ে ভাঙবেনা। --আমার মন বলছে, খুব শীঘ্রই তোমার জীবনে কেউ আসবে, যে তোমার জীবনসঙ্গিনী হবে। --আরে বাদ দাও তো..... কীসব আবোলতাবোল বকতেছো..... --সত্যি বলছি রানা। হয়তো এবার আমাকে বিদায় নিতে হবে। কিন্তু তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে আমার খুব কষ্ট হবে।" বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো জেরিন। আমার বুকে মুখ লুকিয়ে সে কান্না করতে লাগলো। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম: --জেরিন, কিচ্ছু হবেনা.... তুমি একটু শান্ত হও। --আমি চলে গেলে তুমি নিজের ঠিকমতো যত্ন নিবা, নিজের প্রতি খেয়াল রাখবা। আর তোমার বউকে বলবা, তোমার খেয়াল রাখতে।" জেরিনের কণ্ঠটা খুব করুণ শুনালো। আমি কিছুই বলতে পারলামনা হঠাৎ তার এসব কথা শুনে। জেরিন আবার বললো: --যাও, অনেক রাত হয়েছে, বাসায় যাও এবার। ঠিকমতো ঘুমাবে। দেখো রাত জেগে জেগে চেহারার কি হাল করেছো। আর রাত জাগবেনা এভাবে, কেমন? --হুমম...." অস্ফুটে শব্দ করলাম আমি। . . রুমে এসে শুয়ে পড়লাম আমি। ভাবতে লাগলাম জেরিনের কথা। ও হঠাৎ এসব কী বললো আমাকে? কিসের ইঙ্গিত দিলো সে আমাকে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার ফোনটা বেজে উঠলো। এতো রাতে আবার কার ফোন? ফোনের স্ক্রিনে একটা অচেনা নাম্বার দেখা গেলো। ফোন রিসিভ করতে ইচ্ছে হলোনা। বারবার রিং হওয়ায় ফোন রিসিভ করলাম। --হ্যালো.... --হ্যালো, রানা?" একটা মেয়েলী কণ্ঠ শুনা গেলো। --হুমম, রানা বলছি। কে আপনি? --আমি ইশা........" ওপাশ থেকে জবাব দিলো মেয়েটা। হঠাৎ চমকে উঠলাম ইশার কণ্ঠ শুনে। অনেকদিন পর তার কণ্ঠ শুনলাম। সেই যে সে বিদেশ চলে গিয়েছিল, তারপর থেকে আর কোনো কথা হয়নি তার সাথে। আজ হঠাৎ তার ফোন পেয়ে বেশ অবাক হলাম। হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো সে আবার? --কি হলো? কথা বলছোনা কেন?" আমাকে চুপ থাকতে দেখে ওপাশ থেকে ইশা প্রশ্ন করলো আবার। --হুমমম... বলো। তুমি হঠাৎ এতদিন পর? --এইতো দেশে ফিরে এলাম একটা কাজে। কেমন আছো তুমি? --ভালো, তুমি কেমন আছো? --আমিও ভালো। রানা....? --হুমমম..... --কাল একটু মিট করতে পারবা আমার সাথে? --কোথায়? --ভার্সিটি মোড়ে। তুমি এসো বিকেল ৪ টায়। আমি অপেক্ষা করবো। --আচ্ছা। --গুড নাইট, ঘুমাও এখন। --গুড নাইট।" বলেই ফোন রেখে দিলাম। তারপর কিছুক্ষণ ইশার কথা ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম। . . পরদিন বিকেল চারটায় ইশার সাথে মিট করলাম ভার্সিটি মোড়ে। সে আগে থেকেই ওয়েট করে ছিল তার প্রাইভেট কারটা নিয়ে। আমাকে দেখেই মিষ্টি করে একটা হেসে "হাই" বললো। আমিও প্রত্যুত্তরে "হাই" বললাম। তারপর সে গাড়ির দরজা খুলে দিলো, আমি গিয়ে বসলাম তার পাশে। বসতে বসতে বললাম: --তারপর.....কী খবর? --এইতো আছি..... --দেশে কবে এলে? --মাত্র গতকাল এলাম। --কোনো বিশেষ কাজে? --হুমমম..... ভাবছি এবার বিয়েটা করেই ফেলি, কতদিন আর কুমারী থাকবো? --তা পাত্র দেখছো? দেখতে কেমন?" ইশা মৃদু একটু হেসে জবাব দিলো: --দেখতে ভালোই, হ্যান্ডসাম। অনেকদিন ধরেই তাকে পছন্দ করে আসছি। --কে সে? --তুমি নিজে..... --মানে? --মানে তোমার ফ্যামিলি আর আমার ফ্যামিলি মিলে আমাদের বিয়ে ঠিক করেছে? --এসব কী বলছো তুমি? --হুমমম, আমাকে জোর করেছিল আমার ফ্যামিলি বিয়ে করার জন্য। আমি রাজি হয়নি প্রথমে, পরে ওরা পাত্রের ছবি পাঠায়, তোমার ছবি দেখে তখন রাজি হয়ে যায়, আর ছুটে আসি দেশে। --কিন্তু এসবের আমি কিছুই জানিনা কেন? --তোমাকে জানানো হয়নি, বিয়ের সব ঠিকঠাক করে তোমাকে জানানো হতো। --কিন্তু আমি তো এই বিয়ে চাইনি? --কেন? তুমি কি এখনো জেরিনকে ভুলতে পারোনি? --নাহ, আর পারবোওনা কখনো ভুলতে। --রানা, তোমাকে এটা মেনে নিতে হবে যে জেরিন আর নেই। --হুমমম জানি, সে আর বেঁচে নেই। কিন্তু তার সাথে আমার কথা হয়। --তবুও সে বাস্তব নয়। তোমাকে বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। --আমি তো তার আত্মাকে নিয়েই বেশ আছি। --রানা, একটা কথা বলি? --বলো.... --আমাদের বিয়ের পরও আমি তোমাকে জেরিনের আত্মার সাথে মিশতে বাঁধা দেবোনা। তবুও প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিওনা, অনেক ভালোবাসি তো তোমায়। বুঝোনা কেন তুমি?" ইশার চোখে জল দেখা দিলো এবার। --আচ্ছা আমি ভেবে দেখবো...... আর কিছু বলবে? --কেন? তোমার কি তাড়া আছে? --না... --তাহলে আরো কিছুক্ষণ থাকোনা আমার সাথে? অনেকদিন পর তোমাকে এভাবে কাছে পেয়েছি। --আচ্ছা..... এখন কি করবে? --তোমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবো সারা শহরে। অনেকদিন পর দেখছি তো শহরটাকে...... --হুমমম..... ওকে...." . . এরপর দিনের বাকিটা সময় ইশার সাথে কাটিয়ে ফিরে এলাম বাসায়। বাসায় এসে সবার সাথে একটু রাগারাগি করলাম, কেন আমাকে কিছুই না জানিয়ে ইশার সাথে বিয়ে ঠিক করতে গেলো? রাগ করে বেরিয়ে পড়লাম রাতে বাসা থেকে। পুকুরঘাটে গিয়ে মন খারাপ করে বসে পড়লাম একা একা। পুকুরের পানির দিকে চেয়ে জেরিনের কথা ভাবতে লাগলাম। তখন জেরিন এসে পাশে বসলো আমার। বসেই জিজ্ঞেস করলো: --মন খারাপ করে আছো কেন?" --এমনি.... --জানোনা, তুমি মন খারাপ করলে আমার কষ্ট হয়? --কিন্তু আমি কী করবো বুঝতেছিনা...." --বিয়ে করে ফেলো ইশাকে....." --তুমি জানো ইশার কথা? --হুমমম.... তখন তোমাদের সাথে যে আমিও ছিলাম...... --আমি কি করবো এখন বলো? --বিয়ে করে নাও ইশাকে। আমার তো কোনো অস্তিত্ব নেই। এভাবে জীবন চলেনা রানা। তুমি বিয়ে করবা, সংসার করবা, তোমার বাবা মা কতো আশা করে আছে তোমাকে সংসারী দেখতে, তোমার ওরশে তাদের নাতিনাতনির মুখ দেখতে। তাদের আশাটা তোমার পূরণ করা উচিত। আমার শুধু আফসোস থাকবে একটাই, তোমার সাথে সংসার করতে পারলামনা, তোমার সন্তানের মা হতে চেয়েছিলাম, আফসোস তা হয়ে উঠলোনা। তবে মন থেকে চাই, ইশার সাথে তোমার সংসার জীবন সুখী হোক। --আর তুমি কী করবে? --আমি? আমার তো অস্তিত্ব নেই। হয়তো হারিয়ে যাবো.... --না, তুমি হারাবেনা..... --আমি থাকলে যে তুমি ইশাকে কখনো ভালোবেসে উঠতে পারবেনা। তখন তোমার সংসারে অশান্তি নেমে আসবে। --না, আমি তোমাকে হারাতে চাইনা। তুমি যেভাবে আছো, ওভাবেই থাকো। ইশা তো রাজি, সেও বিয়ের পর তোমাকে মেনে নেবে। --আচ্ছা, আগে বিয়ে তো হোক তোমাদের। --হুমমম..... --যাও, এখন আর রাগ করে থেকোনা। খাওনি রাতে তাইনা? যাও, বাসায় গিয়ে এখন খাবে। আর একটা কথা..... --কি? --তুমি কিন্তু ইদানীং আমার কবরে ফুল দেয়া কমিয়ে দিয়েছো। --কাল থেকে রোজ ফুল দেবো। রাগ করোনা তুমি। --বিয়ের পর তুমি আর ইশা মিলে রোজ রাতে আমার কবরে ফুল দিতে আসবা? --হুমমম...." --তাই যেন হয়..... আমি অপেক্ষা করে থাকবো। যাও এখন বাসায় গিয়ে খেয়ে নাও। --আচ্ছা।" বলেই আমি ধীরে ধীরে হাটা দিলাম বাসার দিকে। . *** . কয়েকদিন পর ইশার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। বাসর রাতে আমরা দুজন বের হলাম বাসা থেকে। আগে থেকেই অনেকগুলো ফুল সংগ্রহ করা ছিলো। দুজনে মিলে ফুলগুলো নিয়ে কবরস্থানে গেলাম। তারপর জেরিনের কবরে রাখলাম ফুলগুলো। তখন জেরিন এসে দাঁড়ালো আমাদের সামনে। এসেই বললো: --তোমাদের দুজনকে খুব ভালো মানিয়েছে, সুখী হও তোমরা আজীবন।"
এক কথায় অসাধারণ ছিল
Read all reviews on the Boitoi app
অসাধারণ ছিল গল্পটা💝
গল্পটি আমার অনেক ভালো লেগেছে
সবাই ভালো কমেন্ট করবেন