

সূর্যকে ওপাশের পাহাড়ের আড়ালে ডুব মারতে দেখে ফুল্লরা অলসতা ঠেলে উঠে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার ফোনে একটা ম্যাসেজ এল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল গত সপ্তাহে সেভ করা নামটি, ‘ইংলিশ ম্যান।’ প্রথমে নাম বিভ্রান্তিতে নাম্বার সেভ না রাখলেও, পরে সে ভেবেছিল ওই মানুষটির নাম্বার এই অদ্ভুত নামেই সেভ করা উচিত। হঠাৎ যেন ফুল্লরার হৃদয়ে একটি স্পন্দন মিস গেল। সঙ্গে-সঙ্গে সে পুনরায় পূর্বের জায়গায় বসে পড়ল। ম্যাসেজ অন করে দ্রুত পড়তে শুরু করল। কয়েকটি লাইনে ওমর লিখেছে, দূর পাহাড়ে দেখেছিলাম পাহাড়ি এক ঝর্ণা, মুখটি তাহার সোনার বরণ কিছুতে তুলনা হয় না। দিবা-রাত্রি, কিংবা স্বপ্ন-কল্পনাতে কেবল তারই দখল, তাকেই ডাকছে মন কারণে অকারণ, এ কেমন অদ্ভুত স্মৃতিচারণা! চিত্তে জাগছে তাকে ফের দেখার সাধ এ কি আমার অপরাধ, বলো পাহাড়কন্যা? ওমরের পাঠানো ম্যাসেজটা ফুল্লরা অসংখ্যবার পড়ে ফেলেছে। যতবার পড়েছে, ততবারই তার মন শিহরিত হয়ে উঠেছে। এ যেন তার যত প্রশ্নের উত্তর। ওমর কি জেনে গেছে তার মনে কী চলছে? এই কথাগুলোর মানে কি এটাই দাঁড়ায় যে, ওমরের মনের বর্তমান অবস্থা ঠিক তারই মতো? ফুল্লরা সেই ম্যাসেজের উত্তর দিলো রাতে। সে লিখল, “হতে পারে সজ্ঞানে সাধ জাগা অপরাধ নয়।” ঠিক এক মিনিটের মাথায় ওমর লিখল, “তবে একে কী বলা যায়?”
যখন এই পৃথিবীতে পাহাড়ের প্রতি মুগ্ধতা নেমে আসে । তখন আমার মনে সুবাতাস বয়ে বৃষ্টি নেমে আসে । রাতেরা প্রচণ্ড মায়া নিয়ে জোছনার ছায়া নিয়ে আসে । এসে মনে করিয়ে দেয়, এই পৃথিবী তোমার । এই ছায়া তোমার । এই আলোতে ভেসে যাওয়া চুপিসারে মায়া দিয়ে রাখা সৌন্দর্য তোমার । তখন আমি হাসি । মনখুলে জানাই এই পৃথিবীতে পাহাড়কে পছন্দ করা আমার জীবনে শুধু অনুভবের শত সুর । এই পৃথিবীতে প্রকৃতির যত মাতাল করা সৌন্দর্য তা আমার মনের রাজ্যে অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায় প্রত্যহ । রোজ রোজ এসে কড়া নেড়ে বলে যায়, আমাকে নেও । আমাকে নেও । তাই তো পৃথিবীতে বয়ে আসা সব প্রকৃতির বর্ণনা স্পর্শ করতে করতে আমাকে আবেশিত করে দেয় । মায়ায় ফেলে দেয় । এই পৃথিবী জানে, প্রকৃতির প্রেমে একবার পড়লে কী পরিমাণ নেশায় মাতাল হতে হয়! গোটা পৃথিবী তখন ভীষণ মত্ত হয়ে যায় সবকিছুতে । আমার এই মত্ত থাকা জীবনে তখন একরাশ কল্পনা আসে । আসে ভালোবাসায় আচ্ছন্ন হওয়া মুহূর্তগুলো! এই পৃথিবীতে ভীষণ মায়া নিয়ে আমি অপেক্ষা করি রাতের । কেনো জানেন? রাতে অনুভূতি প্রখর হয় । সেই প্রখর হয়ে থাকা অনুভূতিতে আমি রোজ খুঁজি প্রিয় আর অচেনা থেকে হঠাৎ করে প্রিয় হয়ে ওঠা সব গল্পের । যে গল্পেরা আমাকে ভাসিয়ে নিবে, আবেগতাড়িত করবে । আর বুঝাতে ইচ্ছে করবে বলতে বলতে, এই পৃথিবীতে সুখ নেমে এসেছে । যে সুখে তুমি শান্তি পাও । যার প্রতিটি মুহূর্তে এক আলোড়ন তুলে যায় সবজায়গায় । ভালোবাসারা কোথায় যেন আঁকড়ে ধরে বসে থাকে । তাই রাতগুলো আমার পাঠকসত্ত্বার কাছে এক নিবিড় গাঁথা হলেও, আসলে তা যেন নিজেকে সত্যিকারের আবিষ্কারের সময় । যত নতুন গল্পে অনুভূতিতে মিশে গিয়ে আমি নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাই তত যেন আমার মাঝে এক অন্যরকম সুখ সুখ টের পাই । তাই এই আবেগতাড়িত হওয়া হৃদয় জেনে বসে থাকে বিরহ, বিষাদ, গভীরতা এবং তীব্রতা থাকা আখ্যান গুলো আমাকে বেশি ভালো লাগায় । এই গল্পটাতে হঠাৎ করে আমার মনে হয়েছিল এই পটভূমি যেমনই হোক অন্তত শেষে গিয়ে আমার খারাপ না লাগুক । আমাকে বারংবার মনে না করিয়ে দিক অন্য কিছু । কিন্তু পৃথিবীতে যেন এক অন্য আবেগ চলে এসেছিল । বারেবারে বলে যাচ্ছিল, এই পৃথিবী আমাদের । আমাদের ঘিরে থাকা পৃথিবীতে তুমি শুভেচ্ছা নেও প্রিয় । এই পৃথিবী ইংলিশ ম্যান এর তার পাহাড়কন্যা’কে ভালোবাসার আখ্যান । এই আখ্যানে পটভূমিতে এসেছে অদ্ভুত এক আবেশ । যে আবেশে আমি টের পেয়েছি রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনার মতো করে মিষ্টি সুরে সুরে কিছু অদ্ভুত গাঁথা । এই গল্পের পটভূমিতে তাই গভীরতা মেশানো আবেগে আমি সবসময় ভালোবাসা খুঁজেছি । খুঁজেছি মিষ্টি কিছু রূপকথা । প্রেক্ষাপটে যেন এসেছে অদ্ভুত এক ভারসাম্য । কোথাও যেন কেউ বলে দিচ্ছিল, এই গল্পের ধারা এত সুন্দর ভাবে বয়ে যাবে যেন মনে হবে কোথাও, যে সুরে সবসময় অদ্ভুত এক আবেগ লুকায়িত সেই আবেগে বিষাদের সুর ভেসে উঠলেও তা নেশার মতো অবস্থা করে দিবে । প্রেক্ষাপটে এই আবহকে দারুণ ভারসাম্য দিয়েছে গল্পের দৃশ্যপট এবং ঘটনাপ্রবাহ । এত সুন্দর করে সব সাজানো হয়েছে এবং ভারসাম্য এসেছে গল্পে যে কারণে গল্পটা ভালো লেগেছে । এই গল্পে ভেসে এসেছে বাঙালি হয়েও ইংলিশ ম্যান হওয়া যুবক ওমর এর চরিত্রটি । পাহাড়কে ভালোবাসা, বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের মিষ্টি এই চরিত্রটি দারুণ ভাবে হাসিয়ে যায় খুব । এছাড়াও গল্পে আছে, মিষ্টি, পাহাড়ের ঝর্নার মতো কলকল হাসি দিয়ে বয়ে যাওয়া মেয়ে ফুল্লরা চরিত্র । বন্ধুত্বপূর্ণ, হাসিখুশি স্বভাবের মিষ্টি মেয়েটি মিশে যেতে পারে খুব । বাবাকে ভালোবাসা মেয়েটি কথা বলতে বলতে যেন পৃথিবী জয় করে নেয় । পাহাড় এবং প্রকৃতিতে মিশে গিয়ে অদ্ভুত কিছুর যেন সাক্ষী হয় । এছাড়াও গল্পে আছে খোরশেদ এর মতো বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা এক যুবক । এরকমই করে মিষ্টি ভাবে চরিত্রের গঠন এবং উপস্থিতি গল্পকে ভারসাম্য দিয়েছে খুব । এই গল্পের প্রিয় বিষয়টি হলো, প্রতিটি আবহের সূক্ষ্ম বর্ণনা! এত সুন্দর করে সাজানো হয়েছে বিষয়টি যে কারণে বর্ণনা করার সময়ে যেভাবে গঠন করা হয়েছে পুরোটা তা যেন মুগ্ধকর । প্রকৃতির বর্ণনাগুলো দারুণ ভাবে গল্পের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে । তা যেন কাহিনীতে মিশে অদ্ভুত ধাঁচ দেয়ার চেষ্টা করেছে । যা ভীষণই ভালো লাগিয়েছে । এছাড়াও গল্পের সংলাপ ধারণও বেশ দারুণ ছিল । কোনো গল্পে বর্ণনা, শব্দ চয়ন এবং সংলাপ গঠন যখন দারুণ হয় তখন পটভূমি বাছাইয়ে যদি ভালো হয়ে থাকে তাহলে সেই গল্প অসাধারণ হয়ে ধরা দেয় । এই গল্প যেন তাই হয়ে রইলো । অবশেষে বইটইয়ের একটা জায়গায় গিয়ে একটু হলেও শান্তি পেলাম এই কারণে যে, প্রতিটি দৃশ্যপট এবং প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের জায়গায় একটু ফাঁকা রাখা হয়েছে । কেননা এই ফাঁকা স্থান না থাকলে, দেখা যায় কোনো কাহিনী পরিবর্তন হওয়ার পরে অন্য ঘটনায় তখন মনোনিবেশ করার সময়ে সামান্য সংযোগে ভুল হয়ে যেতে পারে খুব । যে কারণে এই বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ । আরো একটা ভালো বিষয় হলো, গল্পটিতে টাইপিং মিস্টেক খুবই কম পরিমাণে আছে । এই পৃথিবীতে সবাই জানুক, শত শত ভালোবাসার গল্পে ইংরেজিতে অনেক কিছু বলা যায় । বলা যায় ভালোবাসার গল্পে পাওয়ার জন্য এরকম করে অনেক কিছুই । “বি মাইন, আই উইল লাভ ইউ ফর অ্যা থাউজেন্ড ইয়ার্স।” কিন্তু তার উত্তরে বাংলায় শুধু ভালোবাসি শব্দটাই কোথায় যেন স্বর্গীয় হয়ে ধরা দেয় । এই পৃথিবী জানুক, ভালোবাসার অনুভূতি প্রয়োগে বাংলার মতো অদ্ভুত সুন্দর ভাবে জবাব দেয়ার ভাষা কোথাও নেই । কোথাও যেন বাংলায় ভেসে আসা ভালোবাসার জন্য একরাশ উদাসীনতা, নীরবে প্রকৃতিতে চুপ করে থাকাও ভীষণ কাছের মনে হয় । তবুও ভালোবাসা জড়িয়ে থাক । জড়িয়ে থাক একরাশ মায়া । আর কেউ বলে যাক, “এই প্রকৃতি-নিসর্গ, প্রতিটি পাহাড় সাক্ষী, আমি তোমাকে ভালোবাসি আমার পাহাড়কন্যা।” রেটিংঃ ৫/৫
Read all reviews on the Boitoi app